পাঠপর্ব — সম্পাদকীয় বিভাগ, লেখকের অধ্যায়নাম নয়
সাক্ষাৎ
মুদ্রিত পাতা ১–৫৩ এবং ভূমিকা। গোমুখ, রেলপথ, হরিদ্বার।
জাগতিক অজাগতিক · প্রথম খণ্ড · মুদ্রিত পাতা 1–62
নিবেদন মা তুমি আজ নিও গো প্রণাম জাগতিক চোখ খোঁজে না আকাশ, তুমি যে আমার হৃদয় গাঁথা । পাই না তাই বাইরে দেখ; ইচ্ছা হয় মা দেখি একবার মুখখানা । তবু যেন ভয় আঁকড়ে হৃদয় রাখা, তাই তো চরণ খুঁজে নাহি পাই । মা মা বলে অন্তরেই কথা কই, যা কিছু আমার সবই তোমারই দান। কৃতজ্ঞ আমি জনম জনমকার, ভাগ্যবান আমি এমন মা যে আমার । শতকোটি প্রণাম নিও গো মা আমার । / প্রণাম মীনানন্দ তীর্থনাথঃ মীনাক্ষী দেব্যম্বা ।
লেখকের পরিচিতির প্রয়োজন হয়তো এটাই ছিল, কিন্তু নিরস্ত্র রইলাম দুই কারণে — প্রথমত জাগতিক-অজাগতিকের দ্বন্দ্বের মাঝে প্রকৃত লেখকের কৌমার্য সুরক্ষণ সর্বদাই কাম্য। দ্বিতীয়ত পাঠকবর্গের লেখককে অযথা অনুসরণ না করে গল্পের বিভিন্ন চরিত্রের সাথে পথ চলাই বিশেষ উদ্দেশ্য।
এখানে বলে রাখা প্রয়োজন যে লেখকের জ্ঞান আহরণের সূত্র শাস্ত্রপাঠ বা পুঁথিগত হলেও, গুরুর আশীর্বাদে লেখক পার্থিব এবং অপার্থিব সমস্ত শক্তির অবিনশ্বরতার মধ্যে যে লুক্কায়িত ধ্বংসের বীজ আছে, তারই ইঙ্গিতে হয়তো লেখক আমাদের সত্যকে অবগত করানোর একটা প্রচেষ্টা করেছেন এই মৌনতার গম্ভীরতায় — লেখক আমাদের উপলব্ধিতে শান্ত, সমাহিত মৌনব্রত।
যাদের অদম্য ইচ্ছা ও উৎসাহে এই বই সম্ভব হলো, তারা হলো আমারই রক্তজ ও আত্মজ সম্পর্কের বিশেষ কিছু নাম-যা উল্লেখ না করা আমার অমানবিক স্পর্ধা ।~মধুশ্রী, শাশ্বতী, বৈরীকা, ঋতমা; বিশ্বরূপ, অর্কব্রত (মুখাজ্জী) ! । সুদতী, অনিন্দিতা, ঈষা, তৃষা, ইনু । । স্বাগতা, রীণা, নীতা, পায়েল, ঈশানী, গুডলু, নীলাঞ্জন, পাঁচুগোপাল, উমাশংকর, সন্দীপন, সায়ন, সৌরভ, মাধব, অভিনন্দন, রোহিত, দীপক, জয়ন্ত; প্রবুদ্ধ, জয়শঙ্কর, মোহর, বিবেক, সৈ০ব বাণী । ।
প্রুফ চেক্-উমাশংকর, স্বাগতা । । খদতN।
ভূমিকা
এই লেখা কোন রূপকথার গল্প বা নিছক কাহিনী নিয়ে নয়। এই প্রকৃতিতে বেড়ে ওঠা সকল জীবের লুক্কায়িত শক্তির অজানা তথ্য।
জ্ঞানী অজ্ঞানী যে শক্তিকে ভর করে নির্ভয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করে চলেছে। এই অস্থায়ী জগতের স্থায়িত্বের আস্বাদ নিয়ে মোহে মাতাল।
জানি শেষ হব, ছেড়ে যাব সবকিছু। তবু আমারই থাকুক আমার সবকিছু। প্রাণের উৎসখানি জানি বিধাতা তোমার হাতেই বাঁধা। তবু, আমি মহান নই, সে ভাবনা যায় না ছাড়া। ‘হে ঈশ্বর’ খুলে দাও আমার এই ভাবখানি। জ্বেলে দাও এ প্রাণে জ্ঞানের প্রদীপ। যে প্রদীপের আগুনে জ্বলে যাক আমার আমিত্বখানা। এই জীবনচক্রের অক্ষর দ্বারা লিপিবদ্ধ জাগতিক অজাগতিক আমাদেরই কিছু চরিত্র নিয়ে গড়া ঘটনার উল্লেখ।
জীবনে সুখ দুঃখের বাঁধনে আটকে পড়া মানুষ ও জীবনের মনগড়া সুখ দুঃখ ছিন্ন করার চাহিদায় আমাদেরই মতো কিছু মানুষ যারা নেমে পড়েছে হরিদ্বারের পথে।
মাগঙ্গার অমৃতের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আস্বাদন নিয়ে অমৃতপূর্ণ কলস হয়ে, মাগঙ্গার উৎসে মিলিত হবার কামনায়, তাদেরই পথের সাথে মিশে আমাদের এই জীবনদর্শন। মা করুণাময়ী কৃপা করলে আমরা সকলেই একদিন পূর্ণ হব।
এই ভাবনায় আমার এটি একটি ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা মাত্র। আমার এই প্রচেষ্টার ক্ষুদ্র চাহিদা; এটি কোন নিছক কাহিনী বা গল্প না মনে করে এ আমাদের জীবনের সত্য দর্শন মনে করলেই আমি বাধিত থাকব। কামনাকরি মা মঙ্গলময়ী সকলকে সৎ বুদ্ধি প্রদান করুন। সকলেই ভালো থাকুন।।
মুদ্রিত পাতা 1
গোমুখ, যা গঙ্গার উৎপত্তি স্থল। কথিত আছে তার যৌবনতার উদ্দীপনায় শিবের জটায় স্থান পেয়েছে। হিন্দু ধর্মে তার পবিত্র জলকে অমৃত বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। যার পরশে বিষক্ষয় হয়। এই গোমুখ থেকে শুরু করে গঙ্গোত্রী হয়ে হরিদ্বারের পথে প্রথম সমতলে পা রাখলেন জীবজগতের প্রাণবায়ু নিয়ে ‘মা গঙ্গা’।
সাধক জীবনের সাধনার পথে, মায়ের আঙিনায় বেড়ে ওঠা সাধকের একটি লোভনীয় স্থান গঙ্গোত্রী। যেখানে বহু সাধক ঠিক করেছেন তাঁর লক্ষ্যপথ, পেয়েছেন অমৃতের স্বাদ। অমৃতকুম্ভে ডুব দিয়ে তুলে এনেছেন অমৃত জ্ঞানের ভাণ্ডার।
তৃষ্ণার্ত মানুষই ছুটে চলে তাঁর তৃষ্ণা মেটাতে। চাহিদার অতিবাহিত যখন ধমনীতে উৎপত্তি হয়, তখনই দর্শন পাওয়া যায় অমৃত ভাণ্ডার হাতে জ্ঞানরূপী গুরুর। যার পদতলে নিজেকে শূন্য করে, নিজের অদরকারী অপ্রয়োজনীয় জীবনের উত্থান-পতন ছেড়ে, ঋষির মাটিতে জন্ম নিয়ে, পৃথিবীর আয়ুষ্কাল পর্যন্ত অমরত্বের নক্ষত্র হয়ে, অতিমানবের চাহিদায় গুরু নির্দেশিত পথে; গুরুকে সঙ্গী করে সৃষ্টির রসে-বশে নতুন করে জেনে নেওয়া মা গঙ্গার কণারাশি। যে কণা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র করে একত্রিত হয়ে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে মানুষের পাপরাশি।
আর তাই বুঝি আজও সাধক হবার চাহিদায় ছুটে চলেন বহু মানুষ। অন্ধত্বকে বিশ্বাস করে, অজ্ঞানী গুরুর পায়ে নিজেকে সমর্পণ করে পথভ্রষ্ট হয়ে শাস্ত্রের ভালোমন্দ বিচার করে, মানুষরূপী পশু হয়ে গুরুকে সহস্রারে স্থাপন করে, মা গঙ্গাকে সাক্ষী রেখে গঙ্গাপূজায় রত হয়। নিজেকে সাধক ভাবার মূর্খতা দেখিয়ে পাতালে প্রবেশ করে।
এই সুন্দর প্রকৃতির মাঝে বিষবৃক্ষের বোধহয় প্রয়োজন থাকে। এই বিষ
মুদ্রিত পাতা 2
থেকেই অমৃত নির্মাণের উদ্দীপনায় মা গঙ্গা অবিরাম চলমান থাকেন। বিশেষ ভার হতে এই কলিকালে মা গঙ্গার বুকেও চরা পড়ে। আর সেই চরায় দাঁড়িয়ে মিথ্যার বীজ রোপণ করে ঈশ্বরের আশীর্বাদ প্রাপ্ত হওয়ার বুকের আশা বেঁধে তীর্থদর্শন করে মানুষ। ভুলে যায়; তীর্থে অপ্রয়োজনীয় বিষের আনাগোনায় আকাশও ভেঙে পড়ে, প্রকৃত সাধকের আগমনের পথ মসৃণ করে, সাধককেই আহ্বান জানায়।
পথের ধূলিকণা থেকে মাথা উঁচু করা পর্বতমালা, অচেনা গাছ-গাছালির দোল-দোলানি, উৎসহীন জলরাশি, সারি সারি বৃক্ষের পুষ্পবারি, যেন রাজ্যাভিষেকের উদ্দীপনায় মাতোয়ারা। আর তখনই মনে হয়, “হে ঈশ্বর, তুমি কত সুন্দর, আমারই জন্য সাজিয়েছ এই নৈবেদ্যের থালাখানি।” কোথায় রাখিব আমি এই অপূর্ব স্বাদখানি। তাই আমি স্থাপন করেছি ইষ্টরূপে আজিকে এই ব্রহ্মাণ্ডে তুমি তুমিই এনেছ প্রথম মায়াখানি।
যে মায়াতে আবদ্ধ হয়ে তুমিও ডাকো খালি। শিশুর অজ্ঞানতা ক্ষমা কর। এ জগতের মহামায়া দশমহিন্দী তুমি। মা হতে আত্মার উৎসজালি, বেজে ওঠে তনুতে মন্ত্রের ধ্বনি, শুরু হল বর্ণের যান। গুরুর আবির্ভাবে পূর্ণদেহ বীজ রোপণের পরে গঙ্গার জল গিরিরাজ বসে আছে আসনে হাতছানি — গণপতির পদ হতে গন্ধে মাথামাখি। শুরু হল পথ চলা। খোলা আকাশের নিচে চারিদিকে ছড়ানো আছে সাধকের অভয়বাণী।
এবারে এগিয়ে চল — কোলকাতা থেকে রেলগাড়ি চড়ে বাঙালির বীর ভাবার ছেলে বিলেকে স্মরণ করে, সাহস আর উদ্যমে নিজেকে জানার লোভে, ছিন্ন করে ভীতি, অহংকারকে অলংকার করে চড়ে পরা রেলগাড়িতে।
রেলের দুলকি চালে চোখ বুজে যায়, স্বপ্নে ফুটে ওঠে মা গঙ্গার উৎসখানি। কানে বেজে ওঠে মা গঙ্গার চলন গীতি কল…কল…কল…কল। কী যেন বলতে চায়! কত কথা বলা বাকি। ভাবি কান খাড়া করে শুনি, তখনই বিপত্তি ঘটে, কে যে কাউকে ডেকে বলে বেনারস এসে যাওয়ার কথা। তাড়াতাড়ি নামি। চারিদিকে শোরগোল, মিছে ঠেলাঠেলি। শোরগোল আখতদ্ধা কাটে, তবে গাড়িতে বসেই মিলে গেল বাবা বিশ্বনাথের দেখা।
মুদ্রিত পাতা 3
কত লোক বসে আছে নৌকাভরা। দূরে ভাসে দ্বীপমালা, দৃশ্যখানা ভারি মনোরম। কে যেন ডাকছে হাতছানি দিয়ে। দু-চোখ ঝলসে ওঠে; দেখি মা গঙ্গার তীরে কে যেন আছেন ধ্যানমগ্ন, ভাবসমুদ্রে ডুব দিয়েছেন, পেয়েছেন রত্নের সন্ধান।
রেলগাড়ি আবার চলমান হয়, ঘণ্টা বেজে ওঠে। চোখ থেকে সরে যেতে থাকে বাবা বিশ্বনাথের ধাম। যাত্রী বদল হয়, পাওয়া যায় নতুনের দেখা। কানে বেজে ওঠে নতুন কণ্ঠস্বর। নানা বেশে উঠে আসে মানুষের ঢল। সাধুবেশে একজন লোক; পরনে গেরুয়া বসন, কপালে মোটা মোটা চন্দনের তিলক, কাঁধে একটি মস্ত ঝোলা ব্যাগ বিশেষ, গলায় তুলসীর মালা, পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়স, লম্বা চুলে খোঁপা বাঁধা। সবার মাঝে একটু জায়গা করে নিয়েছেন সাধুবাবা। রেলগাড়ি গতিমান হয়ে উঠেছে। ঝোলা থেকে জলের বোতল বের করে কয়েক ঢোক গলায় ঢালেন আর ‘হরি হরি’ বলে প্রণাম ঠোকেন।
একজন যাত্রী সাধুর কীর্তিকলাপ লক্ষ্য করছিলেন। মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎই প্রশ্ন করেন—
যাত্রী : কোথায় যাবেন বাবা?
সাধুবাবা (মৃদুস্বরে) : হরিদ্বার।
যাত্রী : আপনি কি বৈষ্ণব?
সাধুবাবা : হ্যাঁ।
যাত্রী : তবে কেন হরিদ্বার? মথুরা বা বৃন্দাবন নয়?
সাধুবাবা : প্রেমে মেলে প্রেমলীলা / হরিহর সবই খেলা। / মথুরা বা বৃন্দাবন, / হরিদ্বারেও বৈষ্ণবীর চরণ।।
যাত্রী : তবে কেন এত পথ? তুমি বৈষ্ণব কেউবা শৈব?
মুদ্রিত পাতা 4
সাধুবাবা : দীপখানি জ্বেলে দেখ / আলো কী শুধু তোমার হল? / শিব দিলেন অগ্নিখানি / বৈষ্ণবের ঘিয়ে মাখামাখি / উদ্দেশ্য আলোখানি / কর্মভেদে আলাদা ভাবি। / মানুষ ভেবে তুমি আমি, / প্রাণবায়ু তো একই জানি। / ঘুচবে তখনই মনোব্যাথা, / হরি নামে ডুব দিলে খালি।।
সুন্দর! সুন্দর! মন্ত্রমুগ্ধ পথচারী। সাধু! সাধু! রবখালি। মা গঙ্গা যেন নিজ হাতে অভিষেক করছেন। তিলকের পবিত্র মাটির গন্ধ ভেসে আসে।
সময়ের সাথে চলা রেলগাড়ির চাকা থামল। এবার সবার থামার পালা। যাত্রীদের শোরগোল আবার ঘন হয়ে আসে কানে। মা গঙ্গার দর্শন হবে, মনে তাই সবার আনন্দের ভেউ। এসে গেছে হরিদ্বার।
স্টেশনের বাইরে ছোট বড় গাড়ির লাইন। লোকজনের বেশ সমাগম। পথঘাটে বেশ বড় বড় হোটেল ও ধর্মশালা প্রচুর পরিমাণে। আধুনিকতা ছোঁওয়া এই হরিদ্বারে। সব জাতির মিলনস্থল, দর্শনীয় স্থানও প্রচুর। বিশেষ আকর্ষণ ‘হর কি পৌরি’ ঘাট। যেখানে প্রতিদিন সন্ধ্যায় বেশ ঘটা করে মা গঙ্গার আরতি করা হয়। সাধারণ মানুষের ভিড়ও প্রচুর থাকে। মা গঙ্গার বুকে সেখানে ছেড়ে দেওয়া যায় মানুষের উপার্জিত পাপ।
তাই সাধারণ মানুষ ভক্তিভরে মাগঙ্গায় ডুব দেয় ও মা গঙ্গার ঐ উদ্দাম চলমান গতিতে মনोकামনার আছিলায় দীপ জ্বালায় আর মা গঙ্গার বুকে ভাসিয়ে দেয়। অপেক্ষায় থাকে দীপ যেন কোনোভাবে ডুবে না যায়। দূরে ভাসমান দীপ দেখা গেলে ধারণা আছে
মুদ্রিত পাতা 5
মনোকামনা পূর্ণতা লাভ করে।
সন্ধ্যায় মা গঙ্গার গঙ্গা আরতি বেশ মনোরম। গঙ্গার পারে কিছু যুবক দাঁড়িয়ে বড় বড় দীপ তুলে মা গঙ্গার বন্দনা করে, সঙ্গে আধুনিক হিন্দি ভজনগীতি। চারিদিকে আলোর রোশনাই। মা গঙ্গা থেকে আসা শীতল বাতাস বেশ স্বস্তি যোগায়। প্রচুর ভিড় থাকলেও প্রকৃত সাধুর দেখা সেসময় মেলা ভার। সাধুসন্ত সে সময় নিজ নিজ স্থানে নিজের আধ্যিক কর্মে ব্যস্ত থাকেন।
তার উপর এত চাহিদার মেলা থেকে প্রকৃত সাধু নিজেদের দূরে রাখতেই বাঞ্ছনীয় মনে করেন। “ভাব সমুদ্রের তীরে বসে সমুদ্রের সুখ চাহিদার থেকে সমুদ্রে মিলিত হয়ে দুকূল স্পর্শ করার চাহিদায় নিজেকে আলাদা রাখে।” ও মিলন কর্মে লিপ্ত হওয়ার জন্যে গুরুপ্রদত্ত পথ অনুসরণ করেন।
সন্ধ্যা ক্রিয়া শেষ হলে মা গঙ্গার ঘাট থেকে যে যার মত নিজ নিজ উদ্দেশ্যে চলমান হয়। হঠাৎই এক কালো বেশধারী সাধু মা গঙ্গার ঘাটে এসে উদয় হন। আর বেশ জোরে জোরে ‘ব্যোম-ব্যোম-ব্যোম’ শব্দ বলে আর্তনাদ করেন। হাতে মস্ত ত্রিশূল, মাথায় কালো কাপড় বাঁধা। কপালে বেশ লম্বা কালো তিলক। দেখলেই বেশ ভয় লাগে। কিছু লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও কাছে যাবার সাহস সবার হয় না। তারই মাঝে একজন মহাপুরুষের আবির্ভাবের আশায় পদস্পর্শ করে।
সাধুবাবা : (ব্যোম শঙ্কর বলে তাকে তুলে ধরে) তোর কী কষ্ট বাবা?
মার্কবয়সী লোক : বাবা আমার অনেক বাধা, কোন কাজই সিদ্ধ হয় না। আমাকে আশীর্বাদ করুন, যেন আমার সব কাজ সিদ্ধ হয়। বেশ মোটা দক্ষিণা প্রদান করে। আর বাবা খুশি হয়েই ত্রিশূলটা ছুঁয়ে বলেন।
সাধুবাবা : তোর সব কাজ সিদ্ধ হবে। যা বেটা তোর সব কাজ সিদ্ধ হবে। আর কোনো ভয় নেই।
মুদ্রিত পাতা 6
আরেক আত্মভোলা যুবক বাবার কার্যকলাপ লক্ষ্য করছিল। গুরুর চাহিদায় হরিদ্বারে এসেছে। গুরুকে জানার চাহিদায় প্রশ্ন করে বসে—
যুবক : বাবা, আপনি কি শ্মশানচারী অঘোরি?
বাবা : (ব্যোম শঙ্কর বলে হেসে ওঠেন) নারে বেটা আমি শুধু শ্মশানচারী নই, আমি সব জায়গায় বিরাজমান থাকি। লোকের দুঃখ দুর্দশা দূরীকরণই আমার ব্রত। তাই আমি সাধনায় সিদ্ধি লাভ করে পথে পথে ঘুরি, আর অভাগাকে আশীর্বাদ করে তার ভাগ্য ফেরাই। বল, তোর কী কষ্ট? আমার এই ত্রিশূলের স্পর্শে এখনি তা ভস্ম হয়ে যাবে।
যুবক : তবে যে শুনেছি সিদ্ধ সাধকের দেখা মেলা ভার? অনেক পুণ্যের ফলে তার দর্শন পাওয়া যায়। আসলে বাবা আমার কোনো কষ্ট নেই, আমি এই জাগতিক মোহ থেকে ছিন্ন হতে চাই।
বাবা এবার ‘ব্যোমশঙ্কর’ বলে কোনো উত্তর না দিয়েই স্থান ত্যাগ করে। ঠগী বাবা অন্য কারো দৃষ্টি আকর্ষণের চাহিদায় এগিয়ে চলে।
সংসার এরই নাম, / সাধু বেশে নাহি লাজ। / মা গঙ্গা চাহিয়া দেখ, / নানা রঙে ঠগী কত। / কেন কর এই খেলা? / দুদিনে আত্মহারা, / আসিবে তোমার ভেলা, / জানিবে নরক জ্বালা / এই ভবেরতে এই যে খেলা, / গুরুর বেশে ঠগীর মেলা।।
মুদ্রিত পাতা 7
আত্মভোলা যুবক এগিয়ে চলে, মনে অদম্য ইচ্ছা, চাই তার সংগুরুর দেখা । 'হর কী পৌরির' ঘাট ছেডে এগিয়ে চলে । হর কী পৌরির' ঘাট ছেড়ে পথে উঠে পড়ে সেসময় সন্ধ্যায় পথ-ঘাট আলোয় সেজেছে) বড় ছোট দোকানের প্রচুর ভিড় নেমেছে যুবক এদিক-ওদিক দেখে, সন্ধ্যার আমেজে, ক5[ লোকের ভিড়ে ছোট্ট একটি দোকানে চায়ের তৃষ্ণা মেটাতে দাঁড়িয়ে পডে । সেখানেই এক পণ্ডিত বিশেষ মানুষের সাথে আলাপ হয়।
যে তাঁর পাণ্ডিত্যের স্মৃতির ভাণ্ডার থেকে হরিদ্বারের পুরাণ কাহিনী বর্ণনা করতে থাকে । সে জানায় মা গঙ্গার মর্তে পদার্পণের কাহিনী, কোন রাজা হতে ভগীরথ কত বছর কত কঠোর তপস্যা করে মা গঙ্গাকে মর্তে পদার্পণ করান, মা গঙ্গার অদম্য শক্তিতে যখন মর্ত্য ভাসমান; দেবাদিদেব তখন তাঁর জটায় মা গঙ্গাকে আবদ্ধ করে, কমণ্ডুলু হতে তার অংশ বিশেষ মর্তে প্রবেশ করান । আর তাঁর অমৃত রসে জীবজগত উজ্জীবিত হয় ।
হিমশীতল উচ্চ ধারা হতে সমতলে পদার্পণ করে সঙ্গমে রত হন এই হরিদ্বারেই । মা গঙ্গা দশদিকের হোেতা হয়ে মর্তলোকের দেবী দুর্গা রূপে এখানে বিরাজমান মা গঙ্গার সপ্ত ধারায় বিভক্ত হওয়়া ও সপ্ত ঋষির তপস্যার কথা বর্ণনা করেন প্রজাপতি দক্ষের যজ্ঞ কাণ্ড, সতীর প্রাণত্যাগ একান্ন পীঠের সূচনা এই হরিদ্বার ঘিরেই । এছাড়া কত অজানা তথ্য, অজানা পথের কথা, কুম্ভমেলায় সাধু সন্ন্যাসীর সমাগমের কথা দেবভূমির দ্বার এই হরিদ্বার থেকেই ।
কত তাম্ত্রিক আসে তাদের কার্যসিদ্ধির আছিলায় / ঘুরে ঘুরে আস্থানা গড়ে পাহাড়ে, বনে, জঙ্গলে; গুহায় । সাধনায় সিদ্ধ হবার আশায় কুটির জীবন যাপনকে আলিঙ্গন করে; ইন্দ্রিয় সকলের পরিচালক হয়ে সাধক মহা-উৎসবে লিপ্ত হয়ে; নিজ ক্রিয়ায় পাথরে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে নিজের জগতে আত্মমগ্ন থাকে।
মুদ্রিত পাতা 8
জীগতিক অজাগাতক যুবক কিম্তু এনাদের দেখI পাই কোথায়? আমি আমার সব চাহিদার উন্মাদনাতেই তো ছুটে এসেছি । দয়া করুণ আমায়, তাঁদের কোথায় গেলে দেখা পাবো; আমাকে এখনি জানান । পণ্ডিত (সে জানায়) আমি এমন একজন তাম্ত্রিককে জানি; যাঁর কোচো সাধুবেশ নেই, বলেন না, পুরাণ কাহিনীর কথা; সহজ সরল কথায় পাওয়া যায় জীবন-দর্শন, আমি মনে মনে তাঁকেই গুরু মেনেছি ।
তাঁর সত্যদৃষ্টিতে মাথা নত হয়ে যায়, সত্যের তীব্রতার পাপ যেন ভস্ম হয়ে যায় / যুবক : কেন ! মন্ত্রদীক্ষা আপনার হয়নি? পণ্ডিত ঃ না, এখনও হয়নি বহু অনরোধেও অনুমতি মেলেনি । যুবক ঃ উনি কী তবে দীক্ষা প্রদান করেন না?
পণ্ডিত ঃ করেন, গোটা কযেক শিষ্য তাঁর আছে যারা কী না তাঁর সম্মুখে দেবতাকেও প্রণাম করে না সর্বতীর্থ, সর্বদেবত্ব তাঁর মধ্যেই বিরাজমান বলে মনে করে / তাঁরই পদস্পর্শ করে দেবত্বের আস্বাদন পায় মানুষ হয়ে মানুষের পূজা পাওয়া লোকটা বীরত্বের সাথে আশীর্বাদ করেন, তাদের সাধনার পথে অগ্রসর করেন । জানিয়ে দেন, ব্রহ্মাণ্ডের জ্ঞান স্বরূপ গুরুই অন্ধত্ব দূর করেন । অন্ধত্ব দূর হলেই আলোর দর্শন হয় ।
বিশ্বাস এরই নাম ভক্তিতে ভরা গাং মনুষ্য জ্ঞান হীন ব্রহ্মাণ্ডের স্বরূপ পান শিব শক্তির মিলন স্থান গুরু নামেই মন প্রাণ যুবক : তবে চলুন নিয়ে আমায়; তাঁর দর্শন আমিও পেতে চাই ।
মুদ্রিত পাতা 9
জগতিক তাজাগতিক পণ্ডিত তার হদিশ পাওয়াই বড় ভার সগ্ত ধাবাব তীবে জঙ্গলের মাঝে একটি ছোট্ট কুটির আছে তাবশ্য, কিশ্ু সবসমর তার দর্গন সেখানেও হয় 7I / দিনে রাতে বার বার চে্।
করেও ধরা পড়েনা অপেক্ায আছি, হয়তো এই পূর্ণিমায় তমার গুরু বরণের সৌভাগ্য আসবে, শুরু হবে আমার গুরু পূর্ণিমা কথায় কথায় অনেক রাত হযয়ে গেল কাল তোমায় নিয়ে যাব সেই সপ্তধারার তীরে, হয়তো পাওয়া যাবে তাঁর দর্শন, আজ তরে আসি যুবকের উদ্দীপনা আরও বেড়ে যায, সে বেন তখনই ছুটে যেতে চায় তাঁর দর্শনলাভের জন্য ।
বন্ধুত্বের বরণ ঘটে; কাল আবার দেখা হবে; শুরু হবে পথ চলা, যদি পাই তার দেখা, আশার আলোয় মন বেঁধে শুধু রাত্রিটা পার করা সকালে শুনব হয়তো তাঁর কত কথা, চোখে না দেখলেও গুরু যেন মিলে গেছে, হয়ে গেছে তার গুরু পাওয়া। রাতের খাওয়া সেরে বিছানায় শুয়ে শুয়ে আরও কত কথা ভাবতে থাকে । উচ্ছ্বাস, আকুলতায় বিনিদ্র রাত কাটিয়ে ব্রাহ্ম মুহুর্তেই উঠে পড়ে সে I বাহিরে হয়তো অপেক্ষায় রত তার বন্ধু ! নিয়ে যাবে তাকে সেই গুরুর দর্শনে ।
পথে নেমে পড়ে সে, ছুটে আসে সেই মা গঙ্গার তীরে । অন্ধকার কাটেনি তখনও । পথ-ঘাটে ধোঁয়াশা ভাব কানে ভেসে আসে গুরু স্তোত্রাদি পাঠ, দেবভূমির মাহাত্বে শুরু বন্দনার স্বাদ; মনে মনে গুরুকে প্রণাম করে, মা গঙ্গাকে প্রণাম করে, আকাশে তখন সবে আগমনের সাজ; ঠিক যেন ঘোমটা পরা কনে বউ, লাজে রক্তিম ভাব ! এই মনোরম পরিবেশে প্রকৃতির অপরূপ রূপে নবজাগরণ । এক সন্ন্যাসী লম্বা; রোগা ছিপছিপে চেহারা; পঞ্চাশ উর্দ্ধ বয়স, মুখে কাঁচা পাকা বড় দাড়ি ।
মাথার দুপাশ থেকে বেণী বিশেষ জটা।
মুদ্রিত পাতা 10
নেমে এসেছে হাঁটু পর্যস্ত। গলায় হাতে রুদ্রাক্ষের মালা কপালে লাল সিঁদুরের গোলাকার ফোঁটা; পরনে সাদা ধুতি; খালি গায়ে সাদা উত্তরীয় জড়ানো প্রাতঃকৃত্য শেষ করে ঘাটে বসে আকাশের দিকে চেয়ে আছে; এমন করে; যেন সে আকাশে মিলে যেতে চায়; উড়ে যাওয়া মেঘের সাথে নিজেকে ভাসাতে চায়) নির্মল দৃষ্টিতে বোঝা যীয় তার ভাব খানা যুবক সন্ন্যাসীর কাছে সাধুসঙ্গের আশায় যায় প্রণাম করে তাঁর পাশে বসে । সন্ন্যাসীর দৃষ্টি যুবকের উপর পড়ে।
সন্ন্যাসী ঃ কী চাই বাবা তোমার, আমার কাছে? যুবক ঃ কিছু না, শুধু একটু আশীর্বাদ । সন্ন্যাসী (উচ্চ্স্বরে হেসে ওঠেন) ঃ জীবনের অমূল্য ধন তো এটাই । তার চেয়ে বড় আর কিছু চাওয়া যায়? যুবক কিন্তু বাবাজি) আমি তো আমার সব কিছু ছেড়ে এসেছি, আমার তো আর কিছু নেবার নেই । আপনাদের আশীর্বাদ ছাড়া আমি আমার লক্ষ্যে পৌঁছব কী করে? সন্ন্যাসী ঃ কী লক্ষ্য তোমার বাবা? যুবক ঃ আমি ঈশ্বরকে জানতে চাই, আমি তাঁর দাস হতে চাই ।
অপরের দাসত্ব ছেড়ে যার জগৎ তাঁরই দাস হতে চাই । তাই আশীর্বাদ ভিক্ষা করে আমি আমার লক্ষ্যে পৌঁছতে চাই । সন্ন্যাসী (মৃদু হেসে) ৪ ভিক্ষা মেগে অন্ন মেলে, কর্ম করলেই পাওয়া যায় আশীর্বাদ। তাই চাই এ পথের কর্ম । যুবক ঃ কিন্তু বাবাজী, সঠিক কর্ম কী আমার জানা নেই, তবু আমি প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যা দেবদেবীর স্তোত্র পাঠ করি / আর ভক্তি ভরে মা গঙ্গার স্তব পাঠ করি । ১০।
মুদ্রিত পাতা 11
সন্ন্যাসী বাহ! বা; খুব ভালো, কিস্তু বাবা কর্মগৃহের বাইরে বসে কর্ম করলে কী বেতন ঘরে আসে? আগে কর্মগৃহের ভেতরে ঢুকতে হবে; তারপর কর্তা নির্দিষ্ট কর্ম করতে হবে , তবেই তো বেতনের আশা করা যায় লক্ষ্য পথে চলতে গেলে পথের হদিশ চাই; তা না হলে ঘুরে ঘুরে লক্ষ্যভ্রষ্ট হবে অদ্ধকারে চলতে গেলে যেমন আলোর প্রয়োজন হয়; তেমনই এ পথে গুরু ছাড়া কর্ম বৃথী হয় ।
আমার যতটুকু পথ দেখাবার দেখালাম, এরপর খোঁজ কর তাঁর, যে তোমায় খুলে দেবে এ পথের দ্বার / আমি এবার চলি; আমার প্রাতঃসহ্ধ্যার সময় হয়ে এল। যুবক : বাবাজী, আপনি কী এখানেই থাকেন? সন্ন্যাসী না, আমরা সন্ন্যাসী, আমাদের কোনো নির্দিষ্ট স্থান নেই / ঘুরে ঘুরে আস্তানা গড়ি, আজ এখানে; কাল আবার অন্য কোথাও । যুবক : বাবাজী; আপনি কোন মতে সন্ন্যাস নিয়েছেন? সন্ন্যাসী : মত! মত তো সব একই বাবা, পথ অনেক; আর সব পথই ঘুরে ঘুরে সেই একই মত মানে ।
"পথের হদিশ অনেক আছে মত তো সবই ব্রহ্ম মানে আকার হতেই নিরাকার আসে ভেদ ভাবনায় পথ বাছে1l" (যুবককে আশ্বস্ত করে) গুরু তুমি নিশ্চই পাবে, ঈশ্বর সবাইকেই ডাকেন, শুধু একটু স্থির হলেই শোনা যার তাঁর ডাক। এবারে আমি চলি বাবা, এপথে থাকলে পরে আবার পথেই হয়ে যাবে দেখা, কথা হবে আরও অনেক, এ পথে সঙ্গীর বড় অভাব । যুবক : বাবাজী, নিশ্চই হবে দেখ, আমিও নামাতে চাই এই দুঃখের Scanned witn CarScanner।
মুদ্রিত পাতা 12
বোঝা, পেয়েছি আপনার দেখা, দিন তবে আমায় ভিকার ঝোলা । সন্ন্যাসী : না না বাবা, আমি নই, গুরু তো অনেক বড় কথা, আসবেন, ,সময হলেই দেবেন তোমায় দেখা সন্ন্যাসী এবার এগিয়ে চলেন অনেক কাজ বাকী আছে তাঁর িক এবার তাকিয়ে দেখে সময় তো অনেক হল, পথে ঘাটে পরিষ্কার আলো ফুটেছে; মা গঙ্গার ঘাটে বেশ লোকজনে: আনাগোনা শুরু হয়ে গেছে এতক্ষণ কী যে হল, ভাব যে তাকে আঁকড়ে ধরে আছে।
একটু সামনের দিকে এগিয়ে বাঁধানো ঘাটের সিঁড়ি ধরে নেমে $1 গঙ্গার উচ্ছ্বাস গতিতে বয়ে যাওয়া শীতল জলে দুহাত দিয়ে একটু জল তুলে মুখে চোখে জলের ঝাপটা দেয় । ঠাণ্ডা জলের স্শে দেহ শাস্তি পেলেও মন যেন সেই ভার হয়েই আছে । চায়ের তণা মেটাতে রাস্তায় উঠে পড়ে যুবক; পাশেই চায়ের দোকানে; উনুনে সবে দুধ ফুটছে ।
চায়ের দোকানে থাকা ভদ্রলোককে এক কাপ চI দিতে বলে যুবক আরও দুজন পাশে এসে দাঁড়ায় যুবক বাবাজীর কথাগুলো ভাবতে থাকে; কত ভুলকে ঠিক ভেবে আমরা আমাদের আমিত্বূকে বাড়াতে থাকি । নিজেরাই নিজেদের মিথ্যা প্রাসাদে রাজত্ব করি, আর গোটা কয়েক পুস্তক পাঠ ঈশ্বরকে করেই বিচার করি । হঠাৎই আবার মনে বন্ধুর পড়ে যায় তার সেই কথা । আরে ! কোথায় সে? এখন হল অনেক বেলা না জানি যেতে হবে কত দূর । কই সে?
কাল বলেছিল নিয়ে দর্শনে যাবে উতলা আমায়, সেই গুরুর হয়ে ওঠে যুবক এদিক-ওদিক চায়, এখনও আসেনি বোধ হয় । একটু এগিয়ে দেখে `ঐ তো ঐ দাঁড়িয়ে তো সে", রাস্তার একধারে আছে । পরণে কালো রঙের প্যান্ট; আকাশী ফুল হাতা ১২।
মুদ্রিত পাতা 13
জগতিক তাজাগতিক জামা, চোখে চশমা, পঞ্চান্ন থেকে ছাপান বয়স হবে তাড়াতাড়ি লম্বা পায়ে এগিয়ে যায় যুবক যুবক ঃ ~আরে বন্ধু , কতক্ষণ দাঁড়িয়ে?" পণ্ডিত ৪ এই তো, এখনি, সবে নেমে দাড়ালাম যুবক এত দেরি? আমি তো অনেকক্ষণই তোমার অপেক্ষায় আছি পণ্ডিত ৪ না ভাই, বাড়িতে অনেক কাজ থাকে তো, তাই একটু দেরি হল । না চলো; বাস ধরতে হবে, এখান থেকে অনেকটা পথ যেতে হবে পাশেই বাসস্ট্যাণ্ড । তাড়াতাড়ি বাসে উঠে পড়ে দুজনে ।
পাশাপাশি ভালো দুটো সিট বেছে নেয় তারা তাল্সপ কিছু লোক ছড়িয়ে ছিটিয়ে সিটে বসে আছে । বাসে ভিড় তেমন নেই । পণ্ডিত ঃ প্রায় ঘণ্টা দুয়েকের রাস্তা যেতে হবে আমাদের এই ফাঁকে কথা বলে তোমার সাথে বন্ধুত্ব পাকা করা যাবে । যুবক তা তোমার বাড়িতে কে কে আছে বন্ধু? পণ্ডিত ঃ আমরা তিনজন সংসারে, আমি, আমার গিন্নি, আমার ছেলে, গিন্নি আমার কিছু কাল হল খুবই অসুস্থ হাতে পায়ে ঠিক জোর পায় না / অল্প কিছু কাজ করলেই হাঁপিয়ে ওঠে ।
কত ডাক্তার, কত বদ্যি, করা হল । না জানি কী রোগ তাকে আঁকড়ে বসেছে । কোন দাবাই আর কাজ করে না! শেষমেশ, লজ্জার কথা কী বলব, মানসিক ডাক্তার দেখালাম; তাতেও কোনো সুফল দেয়নি । গিন্নি আমার খুবই ভালো, চেষ্টা সে প্রচুর করে, শরীর তার দেয় না / আমি তো এখন বুঝি এটা সেই মহিলারই কাজ, তাই ডাক্তারের দাবাই কোন কাজ দেয় না । যুবক ৪ কার কাজ! কাজ! সে আবার কোন্ মহিলা !
পণ্ডিত ঃ আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে পাহাড়ে চড়তে যেতাম, আর সেখানেই আলাপ হয় অনুরাগ ও রেবার সঙ্গে । রেবা হল অনুরাগের ১৩।
মুদ্রিত পাতা 14
জাগতিক অভ্রাগতিক গত দু-বছর আগে আমরা সবাই মিলে রূপকুণ্ড ট্রযাক করতে যাই! সেখানে আমার স্ত্রী ছেলেও যায় ররাবরহ সমার দোহারা গড়নের চেহারা হলেও প্রাণস্ফূর্তি তার কিছু ছিন না / হাঁপাতে হাঁপাতেও পাহাড় চড়তে সে ভালোবাসত । সেবারও ছিল সাত দিনের ট্রেক । আমার স্ত্রী ও ছেলে নিয়ে আনি বাকীদের সাথে একসাথে কাটাই দশ দিন।
অনুরাগ বলেব] আমাদের সঙ্গে খুব মিশে যায় অনেক কথার মাঝে রেবা তার এক ভাইয়ের কথা আমাদের জানায় সে নাকি বিরাট তাম্ত্রিক ও জ্যোতিষী / তার নাম ডাকও যেমন অনেক, পয়সাও নাকী প্রচুর ।
সে পারে না এমন কাজ নেই, পয়সার বিনিময়ে যেকোন সমস্যাই সে মিটিয়ে দিতে পারে তার ভাইয়ের ব্যাপার-স্যাপার শুনেও আমরাও একবার দেখ করবার ইচ্ছা প্রকাশ করি / ট্রেকিং সেরে ফিরে এলে; রেবা একদিন আমাদের তার সাথে দেখ করিয়ে দেবার প্রতিশ্রুতি দেয় কথামত দিনও ঠিক হয়ে যায় । ছেলের বয়স তখন উনিশ বছর স্কুলের গণ্ডী প্রথম সারির দলে থেকে পার করেছে গিন্নিও খুব খুশি । ছেলের ভবিষ্যতের সফলতার পথের চাবিকাঠি জেনে নিতে আমরাও উদ্গ্রীব।
উচ্চসারির জীবন হয়তো ছেলেকে হাতছানি দিচ্ছে I কোনরকম বাধাবিপত্তি যেন ছেলের পথ রোধ না করে তাই উৎসাহ ভক্তি বিশ্বাস নিয়ে সকাল সকাল আমরা তান্ত্রিক ভাইয়ের পৌঁছে কাছে গেলাম । ব্যস্ত মানুষ, লোকজনও অনেক তারই মাঝে অনুরাগ ও রেবাকে সঙ্গে নিয়ে আমরা প্রবেশ করলাম ঘরে ঢুকেই রেবা ভাইকে জানিয়ে দেয় আমাদের পরিচয় । ভাই হাসিমুখে জানিয়ে পাশের ঘরে বসতে বলেন আমাদের আহ্বান ভাইয়ের রেবা সেই সুযোগে আরেকটু গুনগান করে নেয়় ।
দামী দামী গোছান ঘর আসবাবপত্রে বেশ সাজান বোঝা যায় ব্যবসা বেশ ভালোই জমে উঠেছে । ১৪।
মুদ্রিত পাতা 15
ভাইয়ের বয়স অল্প হলেও বেশ বাবা বাবা ভাব আছে। পরনে বেশ দামি লাল কাপড় গলায় বড় বড় রুদ্রাক্ষের মালা, কপালে লাল তিলক চেহারায় মোটা ভাব বয়সকে বেশি দেখয় চেহারা বেশভূষা দেখলে বেশ ভয় ভয় লাগে । এবারে তাম্ত্রিক ভাই আমাদের কাছে আসেন একগাল হাসি নিয়ে সোফায় বসেন আমরা হাতজোড় করে প্রণাম জানাই, ছেলে উঠে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে ছেলেকে তার সামনে বসতে বলেন । তাম্ত্রিক নাম তোমার? ছেলে অনিমেষ ব্যানার্জী ।
তাম্ত্রিক ৪ দেখি) অনিমেষ তোমার হাতের রেখাটা । (আতস কাঁচ হাতে দুটো হাতের রেখা ভালো ভাবে পরীক্ষা করে) হঁ তোমার তো উচ্চশিক্ষার যোগ দেখা যাচ্ছে, বেশ ভালোই প্রতিষ্ঠা পাবার রেখা স্পষ্ট উঠেছে । গিন্নি (হাসিমুখে) ঃ ও তাই? আর বিবাহ? মানে ভালো হবে তো? নিজেই করে নেবে না তো? তান্ত্রিক না না, ছেলে আপনার এযুগের ছেলে মেয়ের মতো নয়, ভদ্র-সভ্য, ভগবানে বিশ্বাস আছে; আপনাদের কথা মতই সব হবে ।
তব একটা সমস্যা (বলেই হাতটা আরেকটু মনোযোগ সহকারে দেখে কপালে কী যেন দেখে)। ও ঠিক আছে; পরে বলছি। গিন্নি ঃ (বেশ উদ্গ্রীব হয়ে) কেন কিছু সমস্যা দেখলেন? তাম্ত্রিক ৪ (মুখ ভার করে) হ্যা, আসলে ওর কপালের রেখায় একটা মস্ত বড় বিপদ দেখ যাচ্ছে। পণ্ডিত ও গিন্নি ৪(ভয় পেয়ে একসাথে) কী বিপদ! তাম্ত্রিক সব ঠিক থাকলেও, অনিমেষের আয়ুষ্কাল খুবই কম দেখ যাচ্ছে । তার মানে, পঁচিশ বছরেই তার মৃত্যু ফাঁড়া, যা একেবারে পরিষ্কার বোঝা যায় । ১৫।
মুদ্রিত পাতা 16
গিন্নি (ভয় পেয়ে) বলছেঞন আপনি? আমার একমাত্র ঢেলে! তাগ্তরিক (তাকে আশ্বস্ত করে) না না, অত আপনাকে ভাবতে হবে কিছুরই প্রতিকার আছে তাই আমি মানুষের কল্যাগের ',> মহামৃত্যুঞ্জয় মস্ত্ে সিদ্ধি লাভ করেছি । একখানি কবচ ৩ার ফাঁড়া কাটিয়ে দেব তবে, এ5 একবার হোম করেই এই কাড়ে আছে মৃত্যুফাঁড়া বলে কথা । আর হোমকবচ করতেছে বিম বে্শ টাকা লাগবে । পণ্ডডিত ঃ তা কত খরচ হতে পারে?
তাস্ত্রিক দেখুন, আপনারা আমার প্রিয় দিদির সঙ্গে এসেছেন আনশ পারিশ্রমিক তেমন কিছু দিতে হবে না । শুধু একশো দিলেই চলবে । কিন্তু শুধু পুজোর খরচই এক টঠক আপনাদের দিতে ঘি, কাঠ; মধু আর কবচ নিয়ে চল্লিশ হাজার মতো হ খরচ যাবে । তার চেয়ে কমে এই ফাঁড়া কাটানো থ7 যাবে না ।
পণ্ডিত ঃ কথা শুনে আমিও খুব ভীত হয়ে পড়ি, তখন আমার মাধও কোনভাবে কাজ করছিল না; একমাত্র ছেলে; তাঁর জেনে কারও সাথে কোন পরামর্শ বা মৃত্যু ফাঁড়া ছিল দেরি করার সাহস আম; না । তাই আমিও সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে হাজার টাকা অগ্রিম দিয়ে গেলাম আর দশ এলাম কাছে আর হাতজোড় করে প্রার্থনা জানালাম যেন এই ভাইয়ের বিপদ করে দেন ।
থেকে সে আমাদের ভাই-ও একশো শতাংশ = সাফল্যের দুটো ধরে বললেন, কথা দিলেন আর আমার হাত তাই আপনি "এমন কাজ আমি এর আগেও অনেক করেছি] তাড়াতাড়ি বাকি বেশি দেরি না টাকার ব্যবস্থা করাই করে দিয়ে যান; ভালো কালই বাকি টাকা দিয়ে ।" "আমি গিন্নি রেবার হাতে দিন ।" দেব, আপনি দয়াকরে কাজ শুরু কর ১৬।
মুদ্রিত পাতা 17
জগতিক অজগতিক তারপর আমরাও বেশ মন ভার করে ঘরে ফিরি । খুব চিত্তায় আছি দুজনে । এদিকে অনিমেষ মুখে কিছু ট[। বললেও ওর আচার-ব্যবহার কেমন যেন বদলে যায়, সে তার মৃত্যু ফাঁড়ার কথী জেনে নিজের ভবিষ্যতের সব আশাই যেন ছেড়ে দেয় । সে তখন থেকে আর বাইরে বেশি বেরতে চায় ন । বন্ধু-বান্ধবী ছেডে একা একাই থাকতে চায় খাওয়া-দাওয়াও প্রায় একপ্রকার ছেড়ে দেয়, কিছু বললেই যেন ভক ভয়ে থাকে মানসিকভাবে একেবারেই যেন ভেঙে পড়ে ।
তাড়াতাড়ি করে সেই টাকা রেবার হাতে তুলে দিতেই, রেবা তিনদিনের মধ্যে সেই কবচ নিয়ে হাজির হয় । আর বলে এত ব্যস্ততার মধ্যেও সবার কাজ ফেলে ভাই তোমাদের কাজই আগে করে দেয় আর লালসুতো দিয়ে ছেলের গলায় সেই তাবিজ ঝুলিয়ে দিয়ে বলে, এবার যম ও দুয়ার ভাঙতে পারবে না " কিত্তু ছেলে সেই গুম মেরেই থেকে যায় কলেজে যায় না, বাহরে বেরোয় না, কিছু বললেই বলে পঁচিশ বছর বয়স পার করেই সে আবার সবকিছু করবে ।
লেখাপড়া ছেড়ে একেবারে ঘরে বসে যায় ওদিকে ছেলের আচরণ দেখে আমি গিন্নি ছেলের ভবিষ্যতের কথা ভেবে এখনই তার মানসিক ভাব বদলাতে; আবার রেবার শরণাপন্ন হই । রেবাকে সব জানালে, সে তার ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলায় ভাই সব কথা শুনে, এই ক্রিয়া থেকে মুক্তি দেবার জন্য আরও একটি মাদুলির কথা জানায় আর দশহাজার টাকা চেয়ে পাঠায় আর সেই মাদুলি পরিয়ে ছেলের কোনো পরিবর্তন না পাওয়ায়, আমার গিন্নি রেবাকে বারবার জানাতে থাকে।
রেবাও আশ্বস্ত করতে থাকে; 'সব ঠিক হবে' । এইভাবে বেশ কিছুদিন গড়ালে আমার গিন্নি রেবাকে কোন সুফল না হওয়ার কথা আবারও জানালে আর তখনই তাদের রূপ বদলে ১৭।
মুদ্রিত পাতা 18
জগতিক তজাগতিক যায় ডাযা।; গিমিকে মিথ্যেবাদী বলে অপবাদ দেয় তার সিদ্দধ পুরুষ ভাই; তার কোনো কাজই নাকী বৃথা যোয় শা, যার ফল সরাপ এখনও এমার ঢল একপরকার পগলের মতো জীবন-যাপন করছে। আর গিন্নির সাথে তাদের কথী কাটাকাটি হওয়ায়, রেবী C তার তাস্ত্রিক ভাই ধমকি দেয়/ 'মারণ বাণ মেরে গিমিকে শেব করে দেবে; আর তার কিছুদিন পর থেকেই, আমার গি্মিও সত্যি সত্যি অসুস্থ হয়ে পড়ে তারপর ডাক্তার তাম্রিক অনেক করেছি; কোনো লাভ দেয়নি।
যে তাস্ত্রিকের কাছেই গেছি, সে শুধু টাকা নিয়েছে; আর নিজেকে অনেক বড় সিদ্ধ সাধক বলেছে, কাজের কাজ কিছু হয় নি/ যখন সব আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম, তখনই ওনার নাম জানায় আমারই এক বিশ্বস্ত বন্ধু এত ঠকার ফলে কারোর উপর আর বিশ্বাস একেবারেই ছিলনা বন্ধু অনেকবার যেতে বলায় আমি তখন রাজি হয়ে যাই, কিন্তু তাকে ধরা বেশ কঠিন কাজ ছিলI তার এসবের ব্যবসা নেই ।
তাই কোনো স্থান বা সময় বাঁধা ছিল না / তার মধ্যেও গোটা দুবার তাঁর সাথে দেখ করি, কিত্তু এ বিষয়ে তাঁকে কিছু বলার সুযোগ হয়ে ওঠেনি, বা তাঁকে জানাবারও খুব ইচ্ছা আমারও হয়নি । যুবক : কিত্তু কেন? তুমি তো তাঁকে জানাতেই গিয়েছিলে । পণ্ডিত : জানিনা ।
কিত্তু তাঁর কথা শুনলেই যেন অনেক শাস্তি পাওয়া যায় তাঁর থেকে জানার হয়তো অনেক জিনিস আছে; তাঁকে ধরে যতটুকু সময় পাওয়া যায, তা তাঁর কথা শুনেই চলে যায় গিন্নি আর আমি দুজনে একবার দেখ করি, সস্ত্রীক দীক্ষা নেবার কথাও তাঁকে জানাই । তিনি বলেন "হবে হবে, যোগাযোগ রেখো, সময় হলেই পেয়ে যাবে গুরু করার আগে, গুরুকে বেশ ভালো করে পরীক্ষা করে নিতে হয়, আর সেই ফাঁকে গুরুও শিষ্যকে ১৮।
মুদ্রিত পাতা 19
জগতিক তাজাগতিক জেনে নেবে । মাটি বুঝেই তো চাবী সেখানে বীজ ছড়াবে । পাথুরে মাটি হলে তো আর ধান হবে না; বলেই একটু হাসতেন ।" বেশ ছাড়ো এসব কথা, আমাদের এবার নামতে 5বে আর একটু, তারপরই নামব ঐ ছোট্ট দোকানটার সামনেই নামব চলো, উঠে পড়ি ।" বাস থেকে নেমে দোকানের গঁ ঘেঁষে, সরু মাটির রাত্তা ধরে জঙ্গলের দিকে চলা খানিকটা এগোতেই রাস্তা সরু হতে থাকে; বড় থেকে ছোট গাছ ঘিরে জঙ্গলের নিবিড়তা বাড়তে থাকে ।
লোকজনের বেশি চলাফেরা না থাকলেও নিজেদের পারের শব্দই যেন অনেকে মিলে চলার অনুভব জাগায় প্রায় মিনিট পনেরো হাঁটার পর কুটিরের দর্শন পাওয়া যায় একেবারে বড় বড় গাছে ঘেরা জঙ্গল আগাছা কেটে বেশ পরিদ্কার মাটির উঠোন; ঢুকতেই বাঁশের কঞ্চি দিয়ে বানানো ছোট গেটা ভেতরটা বেশ পরিষ্কার, চারিদিকে বড় বড় গাছ দিয়ে ঘেরা । একচালা কুটির, বড় দালান, ভেতরে মনে হয় একটিই বড় ঘর । মাটি, বাঁশ, হোগলা পাতা আর মোটা গাছের কাণ্ড দিয়ে বানানো !
ঘরের দরজা হোগলা ও বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তৈরি । কুটিরের চাল টিন দিয়ে গড়া । কুটির দর্শনে দুজনের মনেই উৎফুল্লতা জাগে আর দ্রুত পায়ে কুটিরে প্রবেশ করে । কুটিরের সামনের ফাঁকা অংশে দাঁড়িয়ে কুটিরের উদ্দেশ্যে প্রণাম করে ।
তাদের আগমনে শুকনো পাতার শব্দে ঘর থকে বেরিয়ে আসেন একজন মাঝবয়সী ভদ্রলোক; সঙ্গে ভদ্রমহিলা পরণে পা-জামা ও ফতুয়া বিশেষ জামা ভদ্রমহিলা লালপাড় সাদা শাড়ি, কপালে লাল বড় টিপ, সিঁথিতে চওড়া করে সিঁদুর লাগানো, তখন বেলা এগারোটা হবে । ভদ্রলোকঃ আমাদের দেখে) কে আপনারা?" ১৯।
মুদ্রিত পাতা 20
জগতিক তাজাগতিক দুজনেই (একসাথে) ঃ আমরা আসলে একটু গুরুজীর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলাম / উনি আছ্েো এখন? ভদ্রমহিলা উনি তো আজ সকালেই শহরের দিকে এক শিষ্যের বাড়িতে গেছেন তবে কাল সকালেই ফিরে আসবেন তা তপনারা এখানে বসুন (বলে মাটিতে মাদুর পেতে দেয়) অনেক দূর থেকে আসছেন বোধ হয়? পণ্ডিত হ্যা, আসলে ওনার সাথে দেখা করবার খুব ইচ্ছে ছিল, তাই সকাল সকাল বেরিয়ে ছিলাম । যবক আপনারা এখানেই থাকেন?
মহিলা না না, পাগলাবাবা, মানে আমাদের গুরুদেব আজ এখানেই রাত কাটাতে আদেশ করেন । যুবক পাগলা বাবা ভদ্রলোক ঃ আসলে আমরা সবাই তাঁকে পাগলাবাবাই মহিলা ঃ ওনার কোনো ঠিক নেই, কখন যে কী করেন তা বোঝা দায়়, তাই...একটু নিজেদের মধ্যে মজা করে পাগলা বাবাই নাম দিয়েছি । তবে সামনে সে নামে ডাকি না । যুবক ৪ কাল কখন ফিরবেন? ভদ্রলোক ঃ তা বলা খুব মুশকিল, মনে হয় সকালেই ফিরবেন । যুবক : আচ্ছা বৌদি, আপনারাও কী ওনার শিষ্য? আপনিও কী দীক্ষিত?
তন্ত্র মতে মহিলা ঃ হ্যঁ, আমার চারবছর হয়ে গেছে, এই পথে পুরনো ও তো আরও একবছর তা আপনারা কথা বলুন, আমি ভাত চাপিয়ে কিছু খেতে হবে তো? দিই । দুপুরে যুবক ঃ না, আবার কষ্ট করবেন? আমরা বাইরেই কিছু খেয়ে নেব। ১০।
মুদ্রিত পাতা 21
বৌদি তা আমার এই কষ্ট দেখতে গেলে; তোমাদের অভুক্তই থেকে যেতে হবে। কারণ এখানে কোনো হোটেল বা খাবার দোকান সামনা সামনি পাওয়া যাবে না । আর আমাদের গুরুদেব বলেই গেঁছেন, 'কেউ এলে, তাদের অভুক্ত রেখো না " হয়তো আপনাদের কথী ভেবেই বোধ হয় বলে গেছেন । তাই আজ আবার সকাল সকাল নিজেই মাছ নিয়ে এসেছিলেন তর বললেো "তোমরা আজ মাছ রান্না করো, আর এই সবকটা মাছ দিয়েই একটা ঝোল বানিয়ে নিও " আপনারা কথা বলুন, আমি যাই ।
তেমন কিছু ভালো না হলেও; দুপুরে দুটো অন্ন পেটে দিতে পারবেন । (বৌদি উঠে পড়েন) । যুবক বন্ধু , দেবালয়ে ভোগ গ্রহণের আমন্ত্রণ, এতো আমাদের সৌভাগ্য পণ্ড্ডিত : এই জঙ্গলে আর কারও কুটির আছে? দাদা : হ্যঁ; আমাদের কুটিরের পিছন দিকে সীতারাম বাবার কুটির আছে বিশেষ বাইরে বেরোন না, অনেক বয়স হয়েছে । যুবক ঃ আচ্ছা; এই ঘন জঙ্গলে জীবজন্তুর ভয় লাগে না? এখানে তো মনে হয় বিদ্যুৎ নেই ।
দাদা : নী, বিদ্যুৎ নেই, তবে জীব জত্তু অনেক আছে ভয় এখন আর আমাদের খুব একটা লাগেনা এই ছোট্ট গেট আর বড় বড় গাছ গুলো রাতের বেলা প্রহরী হয়ে দাঁড়়ায় । তবে আমাদের পাগলা বাবা বলেন "মানুষ রূপী পশুর থেকে এই অজ্ঞানী পশু অনেক ভালো ওরা শুধু বাঁচার তাগিদে শিকার করে শখ মেটাতে নযয় । আবার তাদের একটু ভালোবেসে পেটের জ্বালা মেটাতে দিলে, পোষ্য হয়ে কর্তাকে রক্ষাও করে তাই তাদের সাধক তাদের কাজে ভয় পেও না ।
লাগিয়ে, বে-পথী মানুষের বাধা রোধ করে, নিরিবিলিতে সাধনায় লিপ্ত থাকতে পারে [" যুবক : উনি কী এখানেই পূজা অর্চনা করেন?
মুদ্রিত পাতা 22
জগতিক তাজাগতিক দাদা ৪ হ্ঁঁ, আসুন, ঘরের ভিতরে; এই হল তার বিশ্রাম পালঙ্ক একটা মাঝারি তত্তপোষ, তার উপরে কপল পাতা, দুটো ব্াসিশ, একটি কম্বল আরেকটি চাদর ভাজ করে রাখা, ঘরের মেেটাও মাটি দিয়ে গড়া ঘরের একপাশে তার পূজার জায়়গী । সেখানে কিছু দেব-দেবীর ছবি পটে বাঁধানো, তাঁর গুরু, গুরুমার ছবি, কয়েকটি বাণলিঙ্গ, দেয়ালে একটি খঙ্গ ঝুলছে । পাশে রাখা লাল রং করা ত্রিশূল । আর কিছু পুঁথি, আসন ও লাল কাপড় ।
পরিদ্কার মেঝেতে, বেশ ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা ভাব ফুল, অগরু, কর্পূরের গন্ধ ভেসে আসছে / ঘরে অজানা গা ছমছমে ভাব । বেশ ভয় ও ভক্তি দুই-ই কাজ করে । দুজনেই বেশ ভত্তিভরে গুরুর পদধূলি ছড়ানো মেঝে থেকে ধুলো নিয়ে মাথায় দেয়। হঠাৎ যেন একসাথে আসা কিছু মানুষের: শব্দ কানে আসে ! অনেকে সব দলবেঁধে যেন এদিকেই আসছে) কাঁসর, ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে । যুবক : (তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বাইরে এসে) কী ব্যাপার?
বৌদি : কিছু না; এখানকার গরিব মানুষ শবদাহ করতে এপথে আসে, সঙ্গে জোরে জোরে শব্দ করে কাঁসর, ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে চলতে থাকে/ এটা তাদের রীতি। যুবক ঃ তার মানে এখানে শ্মশানও আছে? বৌদি ঃ হ্যাঁ, আরেকটু এগোলেই নদীর পার, নদীর পারেই শুকনো কাঠ কুড়িয়ে দাহ করে, বা মাটি খুঁড়ে মাটিতে পুঁতে দিয়ে চলে যায় তবে রাতের বেলা দাহ করতে এপথে কেউ আসেনা, সকালের জন্য অপেক্ষা করে তা, চলো, এবারে হাত-মুখ ধুয়ে দুমুঠো অন্ন গ্রহণ করে নাও ।
পেটে খিদেও প্রচুর, তাড়াতাড়ি দালানে আসন পাতা হল শাল পাতার থালায় ভাত, কিছু একটা শাক ভাজা মাছের পাতলা।
মুদ্রিত পাতা 23
জগতিক অভ্রাগতিক ঝোল দিয়ে খাবার সাজানো হয়েছে যুবক তাড়াতাড়ি করে একটি আসনে বসেই প্রশ্ন করে; আর আপণারা? বৌদি এই তো বসুন, আমরাও একই সাথে বসব! আমাদের গুরুদেব আবার মহিলাদের অগ্রে গ্রহণ করার আদেশ করেন নাও, শুরু করো অনুমতি প্রাপ্ত হয়েই যুবক আর বিলম্ব না করেই চর্বন কার্য শুরু করে দেয় খাওয়া শেষ করে, পেট ও মণের তৃপ্তিতে যেন চোখ বুজে আসে বৌদি : (সব কাজ শেষ করে) রান্না সব ঠিক ছিল তো? খুব অসুবিধা হল না তো?
যুবক : অন্নপূর্ণার হাতে অন্ন গ্রহণ করে, শুধু তৃপ্তিরই স্বাদ পেলাম; অন্নের স্বাদ তো বুঝিনি / বৌদি : (হাসিমুখে) বাবা; তুমি সাহিত্যিক নাকী? তোমাদের পরিচয় তো জানাই হল না? পণ্ডিত ঃ আমি প্রশান্ত ব্যানার্জী । যুবক : আর আমি শাশ্বত ঘোষ । বৌদি আচ্ছা প্রশান্ত বাবু আপনাকে খুব চেনা চেনা লাগছে কোথায় দেখেছি বলুন তো আপনাকে? নাকি আমার মনের ভুল !
প্রশান্ত ঃ হ্যাঁ, আসলে আমি এবার আপনাকে চিনতে পেরেছি আর আপনিও আমাকে দেখেছিলেন সৌরভের বাড়িতে। সৌরভ মানে আমার বন্ধু আর আপনাদের গুরু ভাই ওর বাড়িতেই গুরুজীর একটা পূজায় সঙ্গে দেখা করাবার জন্য আমায় ডেকেছিল আপনারাও ওই দিন সেখানে ছিলেন আর আর আমি আপনার থেকেই অনুমতি নিয়ে পূজার ঘরে ঢুকতে চেয়েছিলাম / আপনি আমায় থামিয়ে দিয়ে বলেছিলেন; এখন যে পুজোটি হবে, সামনে হয় না ।
এ পথে সেটি সবার অনেক গুপ্ত পুজো থাকে / আপনি বরং একটু অপেক্ষা করুন।
মুদ্রিত পাতা 24
তারপর দরজা বন্ধ করে আপনারা বেশ কয়েকজন ভিতরে যান / আমি বেশ অনেকক্ষণ থেকে বাইরে অপেক্ষায় ঢিলাম আপনাদের দেরি হওয়ায় আর আপনাদের সাথে কিত্তু দেখা হয়নি । বৌদি ঃ হ্যাঁ, মনে পড়েছে; তাও মাস ছ-সাতেক হবে জাঁক- সৌরভ বেশ -জমক করে পুজো করিয়েছিল। ডাঢেক লোকও ছিল, নিমদ্ভ্রিত তাই খেয়াল করতে পারছিলাম না তা আপনি আছেন তো? ভালো প্রশাস্ত হ্যাঁ, তবে গুরুদেবের আশীর্বাদে; অনেক সমস্যার পরও কোন কিছুই ধরাশায়ী করতে পারেনি ।
আশা ছিল, ঔরু অনুমতি নিয়ে এপথেই স-স্ত্রীক জীবনটা কাটিয়ে দেব কথাটা শেষ হতেই বৌদি বলে ওঠেন । বৌদি : নিশ্চই, তবে প্রশান্ত বাবু এপথে জীবন শুধু কাটেনা, জীবনটাকে জেনে নেওয়াও যায় । আমাদের পাগলা বাবা বলেন যার কিছু নেই সে গাছতলাতেই ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেয়, আর যার সব আছে; সে কোথায় ঘুমাবে সে এই ভাবনায় রাত দেয় জেগেই পার করে তাই জীবনটা না কাটিয়ে, জীবনটাকে জানার আনন্দেই বাঁচা উচিত।
প্রশাস্ত ঃ হ্যাঁ, বুঝলাম, বয়স বাড়লেও, ভাবের বয়স এখনও সেভাবে বাড়েনি । তবে এবার যেতে হবে আমায় হবে; তা ভাই এবার অনেকট} পথ ফিরতে চলো, উঠি, কাল হয়তো আমার আসা হবেনা বাড়িতে কিছু লোক আসার কথা আছে । শাশ্বত : তবে কী কাল আমি একাই আসব? আমার যে ভীষণ দরকার বৌদি : তবে তুমি ভাই, এখানেই রাতটা কাটিয়ে নাও উতলা তোমায় মনে হচ্ছে; যদি তোমার দেখে বড় অসুবিধা না হয় । শাশ্বত ঃ না না, তাতে অসুবিধে কী? এতো আমার সৌভাগ্য এখানে রাত ২৪।
মুদ্রিত পাতা 25
জাগতিক অজ্াগতিক কাটানো এখানে আমি সারাজীবন কাটাতে চাই, তাইতো আমার এখানে আসা । দাদা তবে তুমি আজ এখানেই থেকে যাও, আর কুটিরে জীবন কাটানোর অভিজ্ঞতা বাড়িয়ে নাও প্রশাস্ত ঃ তা ভাই, আমি তবে উঠি, আপনাদের অনেক ধন্যবাদ তমার এই বন্ধুটিকে তবে আপনাদের কাছেই রেখে গেলাম । আবার দেখা হবে । পাগলা বাবা, মানে গুরুজীকে আমার প্রণাম জানাবেন । ভাই; শাশ্বত কাল না পারি, পরশু অবশ্যই আসছি ।
তুমি ভালো থেকো শাশ্বত আমি একটু এগিয়ে দিই তোমায় দাদা-বৌদি আমি এখনি আসছি । (বলে দুজনে কুটির ছেড়ে বেরিয়ে যায় ।) বন্ধু, তোমায় যে কী বলে ধন্যবাদ জানাব; আমার মুখে আর কোনো ভাষা নেই ।
প্রশাস্ত ঃ না, ভাই তোমার সাথে সময় কাটিয়ে আমারও খুব ভালো লাগল, অনেক জমানো মনের কথা বলে আমারও অনেকটা হালকা লাগছে এবার তুমি ফিরে যাও; ওনারা অপেক্ষায় আছেন শাশ্বত ঃ বন্ধু তুমি সাবধানে যেও আবার দেখা হবে বলে, পথ বদল করে কুটিরে ফিরে আসে দাদা-বৌদি দালানেই বসে আছেন দাদা এস ভাই, এখানে এস, আমরা একটু গল্প করে নিই । তা, তোমার কোথা থেকে আসা হয়েছিল? তোমার বাড়ি কোথায়? শাশ্বত আমি কলকাতা থেকে আসছি।
দুরাত হরিদ্বারে কাটাবার পর প্রশাস্তদার সাথে আলাপ হয়, তারপর এখানে । দাদা ৪ ও কলকাতা থেকে? তা এদিকে বেড়াতে এসেছিলে নাকি? কলকাতার বাড়িতে কে কে আছেন? শাশ্বত : না ঠিক বেড়াতে না; আমি গুরুর খোঁজে; এখানে চলে আসি । ১৫।
মুদ্রিত পাতা 26
জীগতিক অভাগতিক কলকাতায় আমার বাবা; মা, দাদা-বৌদি ভাইতি একসাথেট থাকি। আসলে বলকাতা এেকে একটু ঢুকটুব ভেডর আমরী গ্রীমেহ প্া্কি গ্রীমে আমাদের তিনতলা পাকা বাড়ি দিশে ডাক্তার; দাদা সরকারী স্কূলের মাষ্টার, আমি ডাক্তারী যর7 পাশ কিছুদিন শহরে হাসপাতালে চাকরী করি তারপর 40 ওঠা 2 ছেডে ঢুঁড়ে রাবা মায়ের অনুমতি নিয়ে এদিক ওদিক ঘুরতে থশি আর ঘুরতে ঘুরতে আজ এই কুটিরে । বৌদি : সে কী? সব ছেডে দিলে কেন?
শাশত : সে এক অদ্ভূত ঘটনী আমার এক ছোটবেলার বন্ধু সে আমাদেেে গ্রামের, পাশেই থাকত নাম তুহিন । তুহিনদের অনেক জনিত্রশ ছিল । সে বাপ-মায়ের একমাত্র সত্তান / ওর বাবা-মা আনাবে ওনাদের দ্বিতীয় সন্তানের মতোই দেখতেন / তাই তুহিনও একক আমার ভাই-ই ছিল ! তুহিনের বাবা প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ছিলেন] তুহিন ওর বাবার ব্যবসাই দেখশোনা করত ব্যবসার তুহিনকে রাঁচী, কাতে পাটনা, আসানসোল যেতে হত / আমিও ছুটি বেমে ওর সাথে বেড়িয়ে আসতাম ।
এইভাবে বেশ আনন্দেই দিন আমাদের কাটদগি এরই মাঝে একদিন তুহিনের মা, তুহিনের বিয়ে দেবে বলে ঠিক করে । কলকাতার এক বনেদী বংশের মেয়ের সাথে । তুহিনের সঙ্গে সেই আর আমাবে মেয়েকে দেখে আসতে বলে ! কথামতো একদিন নিজের কাজ বাদ দিয়ে সকাল দেখতে পৌঁছে যাই । সকাল তুহিনের হবু বউকে আর তাদের বাড়ির ব্যবহার মেয়েটর রূপ, আভিজাত্য পূর্ণ আদবকায়দা দেখে হয় ।
দুই বাড়িতে তুহিনও বেশ আকৃষ্ট কথামতো বিয়ের মাস পর দিনও পাকা হয়ে যায় সত নভেম্বরে দিন ঠিক হয় তুহিন ও রূপা; রূপা মানে ভালভাবে জানার তুহিনের হবু বউ দুজন দুজনকে আরও ইচ্ছায় বেশ ভালভাবে মেলামেশা শুরু করে।
মুদ্রিত পাতা 27
দেয় । আমিও ওদের দলে থাকতাম রূপা আমাকে মজা করে 'দেওর বলেই ডাকত আমিও 'বউদিই বলতাম আমাদের সম্পর্কটা বেশ মজার ছিল রূপাদের বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত কালী মন্দির ছিল -নিত্য পূজা হত । কালী পুজোর দিন সারারাত জেগে বেশ ঘটা করে পূজা-বলি-হোম হত । সে বছর ছিল অক্টোবরে দীপাবলি / তুহিনের পরিবারের সাথে আমিও সেই পুজোয় আমস্ত্রিত ছিলাম । সারাদিন, সারারাত একসাথে বেশ মজা করে কাটালাম পুজো দেখে পরের দিন ভোগ গ্রহণ করে বাড়ি ফিরে আসতে একটু রাত হয় ।
বাড়ি ফিরে সারারাত জাগার ক্লান্তি আর অনেক গল্প বাকি; সেই ভাবনায় তুহিন সেই রাত আমাদের বাড়িতে কাটায় । পরের দিন সকালে রূপার টেলিফোন আসে বেশ ভয়ে ভয়ে তুহিনকে জানায় তার এক অদ্ভুত স্বপ্নের কথা ভোররাতের স্বপ্ নাকি সত্যি হয়ে যায় / তাই সে এত ভয় পেয়েছে স্বপ্নে দেখে; তারা কোন এক অজানা জায়গায় গেছে; সঙ্গে আমিও নাকী আছি ।
পথে গাড়িতে যেতে যেতে কোনো এক উঁচু জায়গা থেকে আমাদের গাড়ি জলে পড়ে যায় আর রূপা জলে ডুবে মারা যায়় / এই কথা শুনে তুহিন রূপাকে জানায়, "আমি আর শাশ্বত গ্রামের ছেলে, দুজনেই সাঁতারে চ্যাম্পিয়ান; জলে ডুবে তোমায় মরতে দেব না এসব নিয়ে মাথা ঘামিও না /" কিত্তু রূপার সংশয় তবুও কাটেনা, সে বলে লোকে যে বলে ভোরের স্বপ্ন অনেক সময় সত্যি হয়ে যায়, তাই আমার বড় ভয় করছে " তুহিন বলে ওঠে "হ্যাঁ, হতে পারত; যদি তোমার স্বপ্নে এটি জল না হত বলেই হো হো করে হেসে ওঠে ।
তুহিনের হাসি শুনে রূপার তাৎক্ষণিক ভয় কাটে । এদিকে বিয়ের দিন এগিয়ে আসছে আমার উপর দায়িত্ব চাপিয়ে স্বভাববশতঃ তুহিন রূপাকে নিয়েই ব্যস্ত থাকে । আমিও তাই।
মুদ্রিত পাতা 28
জীগতিক তজাগতিক ডাক্তারিতে কম বিয়ের কাজেই বেশি মনোযোগ দিতে লাগলাম দেখতে দেখতে তুহিন আর রূপার বেশ ঘটী করে বিয়ে হয়ে গেল । বিয়ের কাজ সুসম্পন্ন হওয়ায় দু-বাড়ি থেকেই আমার কপালে অনেক প্রশংসা জুটে গেল এদিকে বিয়ের পর তূহিন-রূপা বেশ আনন্দের সাথে প্রথম মাস পার করল / তুহিনকে এবার ব্যবসার কাজে আবার কিছুদিনের জন্য বাইরে যেতে হবে এদিকে রূপাও জেদ ধরে ওর সাথে যাবে তৃহিন আমায় সেকথা জানায় আর আমাকেও ওদের সাথে যেতে বলে ।
যখন কাজে থাকবে, রূপা না একা হয়ে যায় । তাই সে আমাকে তাদের সাথে জুড়তে চায় ওর যুক্তি মেনে আমিও ওদের সাথে চলে যাই । কলকাতা থেকে ট্রেন ধরে পাটনা; পাটনায় একরাত কাটিয়ে রাঁচী চলে আসি । রাঁচীতে দুরাত কাটিয়ে একটু রোমাঞ্চ করবার উদ্দেশ্যে তুহিন গাড়ি ভাড়া করে সড়ক পথেই ফিরতে চায় কথামতো রূপা ও খুশি হয়ে যায় । রাঁচী থেকে উড়িষ্যা হয়ে কলকাতা ফেরার পরিকল্পনায় ভোরবেলায় বেরোই উড়িষ্যার উদ্দেশ্যে!
তারপর উড়িষ্যা ঘুরে কোলকাতা ফেরার পথে মহানদীর উপর দিয়ে যখন আসছিলাম, তখনই বিপত্তি ঘটে । শীতকালে সবে সন্ধে নেমেছে । গাড়ি আমাদের দ্রুতগতিতে নদী পার করছিল । ঠিক শেষের পথে একটি লরি নিয়স্ত্রণ হারিয়ে আমাদের গাড়িতে ধাক্কা মারে আর আমাদের গাড়ি উপর থেকে নদীতে পড়ে যায় পার খুব একটা বেশি দূরে ছিল না / আমরা সকলে যে যার মতো জলে পড়ে গেলেও, তুহিন একহাতে রূপার একহাত ধরে) আরেক হাতে সাঁতরে রূপাকে নিয়ে পারে উঠে পড়ে ।
আমিও সাঁতার কেটে পারে উঠি । কিন্তু রূপার শরীর ততক্ষণে নিথর হয়ে যায় তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে যাই । আমাদের তেমন বড় কোনো আঘাত আসেনি ডাক্তার পরীক্ষা করে জানায় রূপা হার্টফেল করেছে । তুহিন খবর শুনে জ্ঞান হারায় । আমিও যেন সব দেখে-শুনে ২৮।
মুদ্রিত পাতা 29
জাগতিক তাজাগতিক চূপ করে যাই / আর বেশ অসুস্থ বোধকরি আমরী দুজনেই হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যাই; তুহিন বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিল । তিনদিন পর তুহিনের অবস্থা একটু স্বাভাবিক হয় । আর আমাদের বাড়ি ফিরিয়ে আনা হয় রূপার সেট ভোর রাতের স্ব? হবহু সত্যি হয়ে যায় ধীরে ধীরে তুহিন সুস্থ হলেও মাঝে মাঝে কেমন ভূতে ধরার মতো আচরণ করতে থাকে ডাক্তারের চিকিৎসার ফলে দ্রত সেরে উঠছিল তুহিন । আচার-আচরণ আবার আগের মতোই স্বাভাবিক হতে থাকে ।
কিম্তু মাঝে মাঝে সে একা থাকতে চায় আর আমায় বলে "রূপা খুব বোকা ছিল, আমায় ভরসা করতে পারল না " রূপা কেমন আছে জানতে সে প্ল্যানচেট করতে চায় যার দ্বারা এ-কাজ হবে সেই নেশায় মেতে যায় / কখনও বই পড়ে, কখনো একে ওকে ধরে এই করতে গিয়ে এক মুসলিম ফকির বাবার কাছে যায় ফকির বাবা নাকী মস্ত বড় তাম্ত্রিক।
যে কোন মৃত ব্যক্তিকে চোখের সামনে নিয়ে আসতে পারে আর তাদের সঙ্গে কথা বলিয়ে তাদের সম্বন্ধে জানতে ও জানাতে পারে সেই ফকির বাবাই নাকী রূপার হদিশ তাকে দেবে; তাই তুহিন তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে বারবার তার কাছে যেতে থাকে । আমাকেও যেতে বলে সেই ফকির বাবার কাছে, কিন্তু এ ব্যাপারে আমার বিশ্বাস খুবই কম, তাই আমি জরুরী কাজের বাহানায় এড়িয়ে যাই । তবে তুহিন আমাকে এ ব্যাপারে কিছু না জানিয়ে ফকির বাবার কাছে দিনরাত যেতে থাকে।
ফাকর বাবা তাকে জানায় একদিন সন্ধেবেলা একটি কাচের বোতল ও সাদা কাগজ নিয়ে সে যেন সেখানে যায় সেদিন তুহিনের সঙ্গে দেখা করলে সেই কাঁচের বাতল; কাগজ আরও কিছু হাবিজাবি নিয়ে ব্যস্ত থাকে / আমি জানতে চাওয়ায় এসবের মানে কী, তুহিন জানায় কালই সন্ধেবেলা সে এসব নিয়ে ফকির বাবার কাছে যাবে; আর ফকির বাবা নাকী তাকে রূপার হদিশ এনে ২৯।
মুদ্রিত পাতা 30
দেবে আমি ওকে বোঝাবার চেষ্টা করি এসবে না-যাওয়াই বোধহয় ভালো রূপাকে যে আর পাওয়া যাবে না সে কথা সে মানতেই চায় না / আমাকে অগ্রাহ্য করেই পরদিন সন্ধ্যেবলা চলে যায ফকির বাবার কাছে । তারপর পরের দিন রাতে ফিরে এসে আমায় জানায় সে রূপার হদিশ পেয়েছে সেই কাগজে নাকী রূপা লেখে আমি তোমায় খুব ভালবাসি তুহিন " সে নাকী তাকে অনুভব করতে পেরেছে রূপার গায়ের গন্ধ এখনও নাকী ওর সঙ্গে সঙ্গেই ঘুরছে ।
খুব খুশি ছিল তুহিন সেদিন আমাকে বোঝাবার চেক্টী করতে থাকে তার সেই রূপাকে অনুভব করার আনন্দটা আর বলে আমাকেও সে অনুভব করাবে রূপাকে । আমি চুপ করে শুধু শুনলাম । আর খুব মায়া হল ওর জন্যে । ওর কথায় রূপাকে আবার মনে পড়ে গেল; আমারও মনটা বেশ ভার হয়ে গেল আহা-রে বিধাতা, ওদের খাঁচায় বন্ধ স্বপ্ন গুলো পাখি হয়ে আকাশে উড়ে গেল । পড়ে রইল শুধু ফাঁকা খাঁচাটা । তুহিনের মাথায় হাত বুলিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম । এদিকে তুহিন রূপাতে আবার মেতে গেল ।
এভাবে কিছুদিন আবার চলার পর তুহিন যেন সত্যি সত্যি রূপাকে দেখতে পায় আর ওর সাথে কথা বলে । আবার ব্যবসার কাজ আগের মতই করে অস্বাভাবিক হলেও ওর আচারণে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবার প্রয়োজন বোধ হয়নি তবে তুহিন যেন কেমন মাঝেমাঝে অন্যমনস্ক হয়ে যেত । হঠাৎই কোন এক অন্যভাষায় আমায় কিছু বলত । ওর ওই অন্যরকম ভাষা অন্যস্বরের কথা আমি কিছু না বুঝলেও একটা তারিখ শুধু বুঝতে পারি ।
তারপর আবার স্বাভাবিক হয়ে কথা বলত একদিন বিকেলবেলা তুহিনের বাড়ি যাই / তুহিন আমাকে বসতে বলে আর এক কাপ চা খেতে দেয় স্বাভাবিক আচরণই ছিল। তারই মাঝে তুহিন হঠাৎই অন্যরকম আচরণ করতে থাকে/ ওর ৩0।
মুদ্রিত পাতা 31
সেই অন্যভাষার কথা শোনার আবার চাহিদায় রেকর্ডিং করে ফেলি । স্বাভাবিক হলে বাড়ি ফিরে বারবার ২৭ তারিখ ছাড়া রেকর্ডিং শুনেও শুধু আর কিছু বুঝে উঠতে পারি না । এমনই একদিন, সেদিন ছিল রবিবার, তুহিন একসাথে ২৭ তারিখ আমি আর সময় কাটাবো বলে তুহিনের বাড়ি যাই সকালে । সাধারণতঃ তুহিন ভোরবেলাই বিছানা অনেক বেলা হলে ছেড়ে উঠে পড়ে সে সেদিন বিছানা ছেড়়ে ওঠেনি । সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসে ।
ওকে আমাকে দেখতেই দেখে মনে হচ্ছিল মানসিক ভারাক্রান্ত; রাতে বোধ হয় ভালো ঘুম হয়নি গেলে, তাড়াহুড়ো আমার জন্য চায়ের কথা বলতে করে ঘর থেকে বেরতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে ছিটকে সজোরে চৌকাঠে গিয়়ে সিঁড়ির লোহার গেটে মাথায় ভীষণ রকম চোট পেয়ে ধাক্কা খায় । অজ্ঞান হয়ে জ্ঞান যায় কোনোদিন ফেরেনি আর তুহিনের ব্রেন হেমারেজে তুহিন মারা যায় আমি তখন খুবই অসহায় আমার অর্ধেকটা জীবনই আমাকে তখন নিয়েছিল ও । সামলানোই দায় ।
কিছুদিন কাটার পর আমি সুস্থ বোধ করলে তুহিনের সেই একটু এক্সপার্টের কথাবলা রেকর্ডিংটা অডিও হাতে তুলে দিই ! তিনদিন পর তার রিপোর্ট সেই রিপোর্টে লেখা আছে আসে । যাব আমরা ২৭ তারিখ আমি রূপা তোমার কাছে আবার একসাথেই থাকব নিয়ে যাব । শাশ্বত আর বাকি তোকেও তাড়াতাড়ি বোঝা যায় নি।
এদিকে এই অদ্ভুত দুটো ঘটনায দুই পরিবারের পড়ে আর সবাই খুব ভেঙে এই রিপোর্টের আমায় লেখা দেখার পর সবাই ভয় পায় / ও কোনো ঐশ্বরিক শক্তি সম্পন্ন লোকের বলে তবে আমি বাঁচার ছায়ায় থাকতে চাহিদায় এখানে আমি এসবের আসিনি । এও কী সম্ভব ! মানে জানতে চাই । তাই আজ সব এখানে । কিছু ছেড়ে এতক্ষণ অবাক হয়ে শাশ্বতর ফেলে আসা জীবনের কথা শুনছিল ৩৯।
মুদ্রিত পাতা 32
দুজন ।
শাশতর (lখ দুটেো ঢমঢল করছিল যেন চোখের সামনে ঘটে যাওয়া সত্য ঘটনাগুলো রূপকথার কাহিনীর মতো নিছক মিথ্যা গপ্প হতে পারত তাহলে তুহিন তাকে এত কষ্ট দিয়ে চলে যেতে পরত নীI দুহাতে চোখের জল মুছে "আসলে তুহিন আমার শুধু বন্ধু ছিল নং তুহিনের ঢলে যাওয়াটা শরীরের অনেকগুলো অঙ্গের মধ্যে একটা বাদ যাওয়া অঙ্গের মতো সে বার বার মণে করিয়ে দেয় আমার বিকলাঙ্গতার কথা " দাদা ভাই শাশ্বত কিছু হারিয়ে যাওয়া জিনিস খুঁজতে গিয়ে মানুষ আবার কিছু অমূল্য রত্নের সম্ধান পেয়ে যায় যার পরশে অনেক বিকলাঙ্গও অঙ্গের আভাস পায় দুঃখ পেও না ।
জীবনে দুঃখই মানুষকে বিকলাঙ্গ বানিয়েছে। আমাদের পাগলা বাবা বলেন) "দুঃখ কী হয় খুঁজতে গিয়ে সুখের দিন পালিয়ে যায় এদিকে প্রায় সন্ধ্যা হয়েই এসেছে । সায়নসন্ধ্যার প্রস্তুতিতে উঠে পড়়ে বৌদি বলে ভাই; তুমি একটু বসে 1, অতমরো দএন নিত্যক্রিয়া শেষ করে নিই । একটু শাশ্বত একা বসে আকাশের দিকে চেয়ে থাকে; অন্ধকার নামার আগেই পাখিরা দলবেঁধে বাসার ঠিকানায় ফিরতে থাকে ।
ছুটির ঘণ্টার মতো কিচির আর মিচির থাকে সারা দিনের শব্দে একে অপরকে জানাতে নিয়ে কাহিনী গুলো । ছোট্ট মাথা, ছোট্ট দুটো ডানা কাল আবার বেরোবে যুদ্ধজয়ের নাম জীবন, আত্মবিশ্বাস নিয়ে ঝড়ের এরই ধাক্কায় দিশা হারালেও ফিরে আসে । নতুন দিশায় আবার শবদাহ করে লোকগুলো আবার মানুষের ফিরে শুধু পায়়ের যাচ্ছে শব্দ অনেকগুলো মুখে কোনো কথা নেই । কাছের।
মুদ্রিত পাতা 33
জগতিল ৩জগতিক মানুখটকে নিঞেছ দরতে ৩৩ন পোডবার পর 'মুতির বেঝা কা4 নি থেন টল৩ে 06তে b৮1৫৩ থাশ; । আলো ধকতে থাকতেছ আমগাটা ভালো করে দেখে নেওয়া য।9 শষত ৬ঠে ৭৬ে একট এগিয়ে হয়তো ডান দিকেহ নদীর গ[র সামনে বেশ ঘন ভগল বলেই মণে হদছে দু'এক প। এগোতেই জগলের ভিতর আরেকটী কুটির দেখতে পায় ও এটাও বৌধহয় সেই সীতারাম বাবার কুটির । যায় যথা দাদা জানায় কুটির দর্শন করে শীশ্বত সামনের দিকে এগিবে যায সক্নষ পগাের ছাপেই রাম্তা হয়েছে ।
ছোট ছোট ঝোপঝাড় চলতে গগিযে খোবে মাবে ঞ্ামা কাপড় আঁকড়ে ঢেনে 4ররে যেন অপরিচিত কারো সঙ্গে একটু আলাপ করতে চায় বেশ রোমাধাকর ! একা এই পগথে চলা এদিকে প্রায় আঁধার হয়েই এসেছে হাতে কোনো টর্চ থাকলে আরেকটু এগোনো যেত । এভাবে অন্ধকারে একা এগিয়ে যাওয়া মানে অহেতুক নিজেকে ভয় দেখানো । তাই কুটিরে ফিরে আসাই বুদ্ধিমানের কাজ ভেবে কুটিরে ফিরে আসে / কুটিরে ঢোকার দাদা বৌদি দাঁড়িয়ে । মুখেই বৌদি আরে ভাই; কোথায় গিয়েছিলে?
অন্ধকারে অপরিচিত রাস্তায় পথ হারাবার ভয় থাকে। শাশত না না এই সামনেই, এইখানেই ছিলাম একটু দেখেছিলাম, কোনদিকে নদীর পার । বৌদি নদীর পার তো বেশ কিছুটা, বাবা তোমার তো আছে দেখছি । বেশ সাহস শাশ্বত : না না, গ্রামের ছেলে তো, অন্ধরকারে অভ্যস্ত । তাই এতটাও ভয় লাগে নাI বৌদি : তবে এপথে আলোতেও খুব সাহস লাগে কিন্তু ।
মুদ্রিত পাতা 34
জীগতিক তজাগতিক শাশ্বত কেন? কেন? আলোয় আবার কীসের ভয়? বৌদি তুমি না বলেছিলে দীক্ষা নিয়ে এপথেই হাঁটবে । পথ যে অম্ধকারকেও দেখা শেখায় । আর অন্ধকারে তো অচেনা ভয় থাকে ।
আলোয় দেখলেই হাড হিম হয়ে আসে শাশ্বত ঃ কিত্তু কি দেখা যায় বৌদি এই ধর হাওয়া দিয়ে গঠন করা কোনো মানুষ যে তোমার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে অথচ তুমি তোমার চোখ দিয়ে তাকে দেখতে পাচ্ছ না জ্ঞানের আলো মনে প্রবেশ করলেই চোখের আলো বেডে যায় আর সেই আলোয় তাকে সামনেই দেখতে পাওয়া যায় ।
সে হয়তো আকার গঠন করে তোমার সামনে দাঁড়িয়ে হাওয়ায় দুলছে [ হাওয়ায় বদ্ধ অনেকটা বড় বেলুনের মতো মুখ হাত পা ও শরীর গঠন করে তোমাকে ডাকছে তোমাকে হয়তো কিছু জানাতে চায় তোমায় একটু ছুঁতে চায় বা ভয় দেখিয়ে সরাতে চায় । এই ধরণের জিনিস অন্ধকারকে জানলেই পাওয়া যায় । শাশ্বত ঃ তার মানে? তারা কোনো ক্ষতি করতে পারে? না কি শুধু এমনি এমনিই ভয় দেখয়? বৌদি : এমনি এমনি ভয় তো মনের অন্ধকারে হয় । আলোতে তো বিচার করেই লোকে ভয় পায় তাই না ।
শাশ্বত ঠিকই কিত্তুব ওরা ক্ষতি করবেই বা কেন? আমরা ক্ষতি করি? ওদের কোনা বৌদি না, তবে অন্ধকার ঘোচাতে পায় পারলেই তো দুজন দুজনকেই দেখতে আর দুজনারাই অচেনা ভয় মানাতে সময় ভাল হলে আর ক্ষতি নেয় পরিচিতি নেই । শাশ্বত তার মানে ভূত প্রেতও হয় আবার তাদের বৌদি দেখাও যায়? তুমি দেখনি বলে হয় না এমনও তো নয় না জানি হয়তো 98।
মুদ্রিত পাতা 35
জীগতিক অজাগতিক অঢোেক কিছু আছে যা আমরা দেখিনি বা বুঝি না / তা বলে তা মানব না এমন অহংস্কারও তো ঠিক নয় । শশ্ত ৪ না ঠিক অহংস্কার নয় তবে অনেকই অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েও কখনও আমাকে এমন কিছু দেখাতে পারে নি । তাই এই ব্যপারে তেমন ভাবে বিশ্বাস আমার গড়ে ওঠে নি । বৌদি : (একটু হেসে) কিসের প্রতিশ্রুতি? কে তোমায় কি দেখাবে? ভূত? ভূত ভগবান আবার দেখানো যায় নাকি? সে তো নিজে নিজেই দেখতে হয় কত দেখবে?
যাক না কিছু দিন এই পথে সে তো তোমার সঙ্গে সঙ্গেই ঘুরে বেড়াবে তখন নিজেই বলবে আর চাই না বাবা দেখতে, একটু একা থাকতে দে, বলেই হেসে উঠে পরে ! বৌদি : এখন বেশ অন্ধকার হয়ে এসেছে আমি হ্যারিকেনটা জ্বালিয়ে নিয়ে আসি বলে ঘরের ভেতরে চলে যায় দাদা শাশ্বত পথে থাকবে তো এমন জঙ্গলে কখনো রাত কাটিয়েছো? শাশ্বত ৪ আমি তো এপথ ছাড়া আর বাকি সব পথই বন্ধ করে এসেছি। আর জঙ্গলে রাত কাটিয়েছি বন্ধুরা সবাই মিলে।
তবে এমন হ্যারিকেনের আলোর পরিবেশে নয় সেখানে আলো পাখা ঘর বাড়ি সব আধুনিক ব্যবস্থা তাতে ভয় তেমন লাগেনি । বৌদি ঃ (হ্যারিকেন হাতে বৌদি সামনে এসে দাঁড়ান) তবে কি এখানে ভয় পাচ্ছ ভাই? শাশ্বত : না তেমন নয়, তবে এমন পরিবেশে বেশ ভয় ভয় লাগে আপনাদের দেখে আর আপনাদের সাথে থেকে ভয় তেমন আর হচ্ছে না কিত্তু আপনার কথা মতো কিছু সামনে এসে দাঁড়ালে সর আমি দেখতে পেলে কি হবে জানি না । দাদা তবে একটু সাবধান করে দি ভাই তোমায় পুজোর কোনো জিনিস 9৫।
মুদ্রিত পাতা 36
জিজ্ঞেস করে যেন হাত দিয়ো না / তাহলে এমন কিছু দেখবে যে মাথা খারাপ হয়ে যাবে । শাশ্বত ৪ না, না, আমি এসবে একেবারেই হাত দেব না । আচ্ছা দাদা আপনাদের গুরুদেব আপনাদের অজাগতিক কিছু দেখিয়েছেন কখনও । দাদা (একটু হেসে) না ওনাকে কিছু দেখাতে হয় না / কিছু দিন মিশলেই বুঝে যাবে লোকটাই হলো অজাগতিক । প্রথম প্রথম খুব অবাক আমিও হতাম বিজ্ঞানের ছাত্র তাই বুদ্ধি দিয়ে বিচার করার চেষ্টী করতাম কিত্তু সেই অঙ্ক মেলাতে পারিনি !
পরে বুঝলাম কিছু একটা বিষয় জেনে এনাদের বিচার করা যাবে না তাই আর অবাক হই না। শাশ্বত আপনাদের কাছ থেকে গুরুজির কথা শুনে ও তাঁর সম্বন্ধে জেনে ওনাকে দেখর ইচ্ছা আরও বেড়ে গেল কালই তো আসবেন তাই খুব উৎসাহেই আছি । বৌদি হ্যা কালই তো আসবেন তবে চলো এখন তাড়াতাড়ি খাওয়া দাওয়া সেরে নি ওনার গল্প শুরু করলে সারারাত কেটে যাবে।
তাই এখন থাক; তাকে সামনে থেকে দেখে নিজেই ওনাকে নিয়ে ভাবতে থেক/ তবে ভাই রাতে পরোটা আর আচার আর কিছু রান্না নেই; তোমার অসুবিধে হবে না তো? শাশ্বত : কী বলছেন? এই জঙ্গলের না, ভেতরে পরোটা এ তো ভাবাই যায় আমারই খারাপ লাগছে আপনারা হয়ে উঠেছেন । হয়তো আমার জন্যে ব্যাস্ত বৌদি "তোমার খারাপ লাগার কিছু নেই" আমিতো তোমায় আমাদের ভাবের সাথে ভাই বলেছি কথা বলার জন্যে তো এইটুকু মিল থাকে আর ভাইয়ের করতেই হয়, তবে নাও, সকলে একসাথে বসে।
মুদ্রিত পাতা 37
জীগতিক ততাগতিক পড়ি । এই হ্যারিকেনের আলোয় পরোটী আচার খেতে দেখ (বেশ ভালোই লাগবে । শাশত ; "3্যা, চলুন আমিও খুব উৎসাহী" খাওয়া শেষ করে "আচ্ছী দাদী আপনারী এখানেই থাকেন না অান্য কোথাও?" দাদা নাহঃ এখান থেকে আরো কুড়ি কিলোমিটার দূরে আমাদের এক ছোট্ট বাড়ি আছে) সেখানেই আমাদের দুজনের সংসার, সপ্তাহে একদিন বা দশদিনে একদিন করে এখানে আসি, আর উনি যদি আদেে করেন তবে মাঝে মাঝে থেকেই যাই ।
শাশ্বত "ওহ" 'তার [মানে আপনারা গৃহী, সংসারে থেকেই দীক্ষা গ্রহণ করেছেন?" দাদা : 'হ্যাঁ' । তাতে কী হয়েছে? সংসার করলে কী আর পুজো করা যায না? আমাদের গুরুজী পাগলা বাবাও তো তাই, ওনার বাড়ি তো কলকাতায় শাশ্বত : তাহলে এই যে আশ্রম, এই আশ্রমে কেকে থাকেন? দাদা কেউই নয় যখন পাগলা বাবা এখানে আসেন; সাথে দেখা সেই সময় ওনার করতে সকলে আবার এই কুটিরে চলে হলে আমরাই মাঝে আসে / তা না মাঝে এসে দেখশুনো করে যাই ।
শাশ্বত : আচ্ছা পাগলা বাবা মানে গুরুবজীর ও সংসার আছে? না কি উনি একাই কোলকাতায় থাকেন? দাদা ৪ হ্যাঁ, সংসার মানে রীতিমতো সংসার আমাদের গুরু, গুরুমা গুরুপুত্র সকলেই আছেন পাগলা বাবা আবার সপরিবারেই এখানে মাঝে মাঝে চলে আসেন ।
মুদ্রিত পাতা 38
বৌদি ভাই শাশ্বত তুমি কি এই দালানে শুতে পারবে? না তোমার ঘরে ব্যবস্থা করবো? শাশ্বত না, না, আমি এই দালানেই শুয়ে পড়বো তাতে আমার কোনো অসুবিধাই হবে নাI বৌদি তবে তুমি আর দাদা এই দালানে শুয়ে পড় । শাশ্বত ৪ না না আমি এখানে একাই থেকে যেতে পারবো । গরম কাল, হাওয়াও আছে বেশ বরং ভালই লাগবে এই দালানে একা শুতে। বৌদি : তবে দেখ একা শুতে গিয়ে ভয় করবে না তো? শাশ্বত আপনারা তো পাশেই আছেন আর পূজা গৃহে ভয় কি?
আমার ব্যাগে টর্চ আছে কোনো অসুবিধা হলে টর্চ জ্বেলে হয়তো একটু বিরক্ত করতে পারি আপনারা শুয়ে পড়ুন / বৌদি : তবে শুয়ে পড়ো আমাদের আবার সকাল সকাল উঠতে হবে । (বলে দালানে একটি মাদুর চাদর আর বালিশ দিয়ে বিছানা করে দেয় ।) এই হ্যারিকেনটা বরং এখানেই থাক ভয়ে টর্চ না খুঁজে পেলে হ্যারিকেনটা হাতে নিয়ে আমাদের ডেকো (হাসি মুখে) শাশ্বত আপনি আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন না তো? বৌদি ভয় দেখিয়ে আমরা ভয় পাওয়াই যাই তখন না ।
তবে নাও শুয়ে পড় আমি চারিদিকটা বেশ অন্ধকার দিতে কুটিরের দুটো কুকুর যেন পাহারা চারপাশে ঘুরছে শাশ্বতর নিস্তব্ধতায় কানে ঝিঁ-ঝিঁ পোকার শব্দ বাজছে মাঝে মাঝে গাছগুলো যেন দুজন হাওয়ায় দুলে ওঠা বড় বড় দুজনকে ছুঁতে চাইছে । শাশ্বত হ্যারিকেনের আলো কমিয়ে সবে মাথা মাথার রেখেছে কাছে রাখে । বালিশে হঠাৎই দূরে ডাকতে থাকে । একদল শেয়াল এক এক করে ৩৮।
মুদ্রিত পাতা 39
জীগতিক তজাগতিক শাশ্বত কি হল বুঝতে বালিশের নিচে রাখা টচ জ্বেলে নিয়ে একটু এদিক-ওদিক দেখে একটু দূরে মোটা গাছটার কাছে কে যেন সরে যায়, ভাল করে গাছের চারপাশে আলো দিয়েও কিছ দেখা গেল ঢাI / ভগন পেয়ে মনের ভুল ভেবে টর্চ নিভিয়ে আবার শুয়ে পড়ে শাশ্বত । সবে চোখ বন্ধ করেছে আবার আর তখনই কুকুর দুটো ঘেউ-ঘেউ করে ডেকে ওঠে ।
শাশ্বত তাড়াতাড়ি করে আবার টর্চ জ্বেলে গাছের কাড়ে আলো দিতেই কারা যেন সবদল বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে আর তাকে দেখছে ভাল করে দেখার আগে সব মিলিয়ে গেল । শাশ্বত এ তো মহা মুশকিল কি যে হচ্ছে কিছুই তো বোঝা যাচ্ছে না এসব মনের ভুল তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ি কিছুক্ষন চোখ বোজার পরেই বিকট চিৎকার আয় আয় বলে সীতারাম বাবার কুটিরের দিক থেকে কে যেন কাকে ডাকছে । শাশ্বতর এবারে বেশ ভয় ভয় লাগছে ।
একটু পরেই মানুষের শব্দ বুঝে মনে কিছুটা সাহস বাড়ায় না, এবারে চাদরটা মুড়ি দিয়ে এখন ঘুমতেই হবে; ভেবে চোখ বুজে রাখে সবে তন্দ্রা লেগেছে । শাশ্বত বুঝতে পারে কে যেন তার চাদর ধরে টানছে । শাশ্বত ঃ একি ! কে কে বলে চিৎকার করে ওঠে চিৎকার শুনে ঘরের ভিতর থেকে দাদা বৌদি একসাথেই বেরিয়ে আসে । দাদা ঃ কী ব্যাপার হয়েছে তোমার? তোমার চিংকার শুনলাম মনে হলো ।
শাশ্বত ঃ হ্যা, ঠিকই শুনেছেন আসলে আমার যাচ্ছিল চাদরটা কে যেন টেনে নিয়ে আমার কে কে করায় ছেডে দেয় । বৌদি : সে কী? কার আবার চাদরের প্রয়োজন হল? দেখিতো বলে টর্চটা ৩৯।
মুদ্রিত পাতা 40
শাশ্বতর থেকে চেয়ে নেেয় দালানের চারপাশটা দেখে কুকুর তো শুয়েই আছে । আর ওরা তো চাদর টানবে না গলেো কট তো নেই ভাই; তোমার চাদর টানবে কিঢত শশত ৪ কিস্তু সত্যি কেউ আমার চাদর টানছিল । আমি তখনও ঘুমোহ আমি স্পষ্ট বুঝেছি কেউ আমার গা থেকে চাদরটা $ টেনে যাচ্ছিল । গ০ দাদা ৪ ঠিক আছে বুঝেছি; এসব এখানে হযেই থাকে । (একটু ভালো শুধু চাদর ধরেই টেনেছিল। চাদরটা হেবে) নিতে পারনে হয়তো এবারে পী ধরে টানত ।
তবে ভয় নেই, একটু টানাটনি ছাড়া তার চেয়ে বেশি কিছু করত না । শাশ্বত : বলছেন তার মানে আপনি জানতেন কে করছে? বৌদি : (একটু হেসে;) বলেছিলাম, দাদাকে সঙ্গে নিয়়েই শোও কথাটা শুনলে হয়তো আর কেউ টানাটানি আন্য করত না । একা পেয়ে অচেনা ভোব ঠেকেছে; তাই বোধহয় এমন বরং করছিল দাদাকে নিয়েই শোও এবাৎে শাশ্বত : হ্যাঁ, হ্যঁ, দাদা আপনার এখানে প্রয়োজন আছে বলে দাদা ঠিক মনে হছে আছে; আমি এখানেই আছি; তুমি হবে এবার না ।
ঘুমোও; আর বিছু শাশ্বত : এসব হতে পারে । আপনি তাহলে আগে দাদা : হ্যা থেকেই জানতেন[ তাইতো জানতে অভিজ্ঞতা চেয়েছিলাম, একা জঙ্গলে থাকার কোনো আছে কী না / তবে নাও হবে এবারে বলে দাদা শুয়ে ঘুমিয়ে পড়, কাল কথা শশত পড়ে । যে হল, যাক এবারে লাগছে; পাশ ফিরে সারাদিনের শুয়ে; (ঠাণ্ডা বাতাস গায়ে ক্লান্তিও খুব, দাদা পাশে থাকায় নির্ভয়ে চোখ ৪০।
মুদ্রিত পাতা 41
বুজতেই চোখ লেগে যায় কখন যে ভোর হয়ে গেল একদল পাখির ডাকে ঘুম ভেঙে যায় শাশ্বতর হাতের ঘড়িতে তখন ভোর পাঁচটা; বৌদি উঠোেন ঝার দিচ্ছেন দাদা ঘরের ভিতর পুজো করছেন তাড়াতাড়ি করে শাশ্বত উঠে বসে । বৌদি : কী ভাই' ঘুম হলো তো? শীশ্বত ৪ হ্যাঁ, কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম; আর ঘুমটা বেশ ভালোই হলো রাতে আর কোনো অসুবিধাই হয়নি / বৌদি তবে নাও মুখ হাত পা ধুয়ে চা খেয়ে নাও। চা করাই আছে।
কথামতো শাশ্বতও মুখ হাত ধুয়ে চা খেয়ে `আমি একটু সকালেই এদিক-ওদিক ঘুরে নদীর পারটা দেখে আসছি ।" বৌদি : হ্যাঁ যাও তবে তাড়াতাড়ি ফিরো । শাশ্বত এগিয়ে চলে, আলো ভালোই ফুটেছে । জঙ্গলের পথ ধরে নদীর পারের দিকে চলতে থাকে । একটিই সরু পথ । পথ হারাবার ভয় নেই । হাঁটতে হাঁটতে নদীর পারে পৌঁছে যায় সে সময় নদীর পারে কেউ নেই ।
ভোরের ঠাণ্ডা হাওয়়ার মেজাজে; নদীর আপন গতিতে বয়ে চলা শাশ্বতর মন যেন আরও সতেজ করে দেয় অদ্ভুত এক টান সে অনুভব করে নদীর পার ধরে এদিক-ওদিক চলতে কিছু আধ-জ্বলা কাঠ পড়ে থাকতে দেখে । শবদাহ করা হয়েছে; তারই হয়তো অবশিষ্ট অংশ বিশেষ, ওদিক ছড়িয়ে আছে । কোথাও কোথাও এদিক হয়তো কাঠের মাটি একটু উঁচু করা; অভাবে মাটিতেই পুঁতে দেওয়া হয়েছে । তবে; এখানে কোনো কুটির বা কোনো সাধু বাবা চোখে স্নিগ্ধ, নিস্তব্ধ পড়ছে না ।
এই পরিবেশে, শাশ্বত নদীর পারেই একটু বসে পড়়ে । ৪১।
মুদ্রিত পাতা 42
ঘনা জসল লোক বসতি নেই বললেই নদীর ওপারে বেশ মনে হ্য় তবে হিংস্র জত্তু থাকতেই পারে । শশত ঃ (ভালভাবে জায়গাটা দেখে নেয়়) এবার ফেরা যাক্ গুরুজীর আজ আসার কথা, জানিনা, কখন আসবেন । তবে কপালে থাকলে হয়তো আজই তাঁর দর্শন মিলে যাবে । ভাবতে ভাবতে কুটিবে পথ ধরে ফিরতে থাকে কুটিরে প্রবেশ করতেই দালানে দাদা-বৌদি আরও দুজন ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলছো ।
বৌদি এইতো শাশ্বত তাড়াতাড়ি এসো এতক্ষণ কোথায় ঘুরলে পাগালা বাবা তো এসে গেছেন তবে তোমার কথা ওনাকে জানিয়েছি, ঘরে আছেন; তুমি বসো / আরেকটু তোমার সাথে আলাপ করিয়ে দিই । ইনি হলেন সতীশ দা, এনারই বাড়ি পাগলা বাবা গিয়েছিলেন । দুজন দুজনকে নমস্কার জানায় আর এই হলো সুমন; আমাদের গুরু ভাই, খুব ভালো ছেলে। সুমন : এই যে শাশ্বত বাবু; আপনার কথা হচ্ছিল; শুনলাম কাল থেবে আপনি এখানেই আছেন শাশ্বত : কোনো উত্তর না করে, গুরুজী কখন এলেন?
সুমন : এই তো কিছুক্ষণ হলো শাশ্বত : গুরুজী কি ভিতরে পুজো করছেন? বৌদি না না, দাঁড়াও দেখি করছেন? (বলে ঘরে প্রবেশ করেন) । পাগলাবাবা ঘর থেকে অমল অমল হ্যাঁ বলুন বলে ডেকে ওঠেন । (দাদার নাম বলে দাদা ঘরে প্রবেশ দাদা বৌদি পাগলা করেন বাবা ঘর কিছুক্ষণ পর দাদা ঃ থেকে বেরিয়ে এই যে ভাই শাশ্বত আসেন এদিকে হলেন সেই এসো, আমাদের যাঁর অপেক্ষায় গুরুদেব ছিলে, ইনিই শাশ্বত : হ্যা, বলেই কাছে এসো প্রণাম করে ৪১।
মুদ্রিত পাতা 43
জীগতিক অজাগতিক পাগলাবাবা শ্বাশ্বতকে তুলে ধরে, শাশত; তুমি ডাক্তার? শাশত ৪ হ্যা, বাবা । পাগলাবাবা তা তুমি এপথে? এদিকে চেম্বার খুলবে নাকী? শশত ৪ না না, আমি তো আপনার সাথে দেখা করতেই এসেছিলাম । পাগলাবাবা ঃ তা বেশ, রমা বলছিল (বৌদির নাম) তুমি কলকাতার বেশ বড় ডাক্তার তাই আমি ভাবলাম জঙ্গলে থাকা সাধু-সন্ন্যাসীদের বোধ হয় মাথার চিকিংসার প্রয়োজন আছে ভেবে এখানে এসেছ । আমার তো বেশ ভয়ই লাগল ।
এমনিতেই তো লোকে সাধুদের ক্ষ্যাপা, পাগলা এসবই ভেবে বসে । তাই হয়তো আমাদের ঠিক করতে এখানে এসেছ । (সবাই হেসে ওঠে ।) শাশ্বত আসলে বাবা আমি আমারই চিকিংসার প্রয়োজনে এখানে এসেছি । কেমন করে এমন ক্ষ্যাপার মতো ক্ষ্যাপলে আপনাদের মতো থাকা যায় পাগলাবাবা ঃ এই তো আরেক ক্ষ্যাপা এসেছে কেমন ক্ষ্যাপার মতো কথা, না ক্ষ্যাপলে পাগল হবে কী করে? আর পাগল না হলে পাথরে প্রাণ আনবে কী করে? একদিন মহাদেব শিব একগাদা ছাই মেখে আমার সামনে দাঁড়ায় ।
আমি বলি, বাবা, এতো ছাই গায়ে মাখো কেন? মহাদেব শিব হেসে বলেন, এই ছাই হলেই তো যায় আমিত্ব আর আমিত্ব গেলেই তখনই হালকা হয়ে আমার মিলিয়ে যায় অঙ্গে পাখিরা যেমন ডানা পেলেই আকাশ ছুতে চায় । আত্মা তেমনই আকার পেলেই মাটি আঁকড়াতে চায় তোমার নামটা কী যেন? হঠাৎই, শাশ্বত : আমার নাম শাশ্বত; বাবা পাগলাবাবা তোমার তো এখানে এক রাত কাটল তো? তা ভালো লাগল।
মুদ্রিত পাতা 44
হ্যা, হ্যা খুবই ভালো লেগেছে । শাশ্বত ৪ পাগলাবাবা ঃ তবে আর কী? থাকো কিছুকাল এখানে আমি একটু সিগারেট জ্বালিয়ে কুটির থেকে বেরিয়ে আসছি বলে একটী গেলেন । বেশ লম্বা লোকটা; পরনে ধুতি লুঙ্গির মতো করে পরা, হালকা সুতির সাদা রঙের পাঞ্জাবী, মাথার চুল গায়ে বেশ উসকোখুশকো । জটা বা লম্বা দাড়ির বালাই নেই । গলায় কপালে কোনো টিপ তিলকও একট পদ্মবীজের মালা দেখা যায পাগলা বাবা দ্রুত গতিতে কুটির থেকে বেরিয়ে '। গেলেন ।
অবাক হয়ে পাগলাবাবার দিকেই তাকিয়ে শাশ্বত থাকেন, যে মোহিত হয়ে রয়েছে। দাদা : ভাই, কেমন লাগল আমাদের পাগলা বাবাকে? কথাটা শুনে শাশ্বতর যেন সম্বিৎ ফেরে কী আর বলব, হল, সূর্যের মতো কোনো আলো শুধু মনে যাকে দেখার ইচ্ছে থাকলেঙ চোখ মেলে দেখ যায় না । শুধু মাথা নত করে যায় । উপলব্ধিই সুমন ঃ বাহ্ ভাই দারুণ তো, তোমার বেশ ভাব আছে আর এই ভাব উনি বুঝেই বলে মনে হ্য় ।
গেছেন বোধ হয় তোমায় এখানে থাকতে বদে শাশ্বত কোনো উত্তর না করেই আর বসে বসে দালানের ভাবতে থাকে এক ( গণে বসে এনাকে পড়েো কোথায় আমার দেখেছি, ঠিক চেনাচেনা খেয়াল লাগছে চিনি । করতে পারছি না / তবে; আমি বৌদি : ভাবছ শাশ্বত ভাই? মন-টোন (একটু খারাপ হেসে) হল নাকী? পাগল না না; আমি হতে? যে পাগলামি ভাবছি আমি পারবো তো এমন এমন পাগল হবার দেখে নেশায় আমাদের মেতে মতো সুস্থ মানুষরাও উঠবে ' 88।
মুদ্রিত পাতা 45
বৌদি পারবে নিশ্চই পারবে নাও এবার একটু ভাব থেকে বেরিয়ে মুড়ি বাতাসা খেয়ে নাও, সকাল থেকে কিছু খাওনি ! (মুড়ি আর বাতাসা হাতে তুলে দেয়), আর সুমন তুমিও একটু খেয়ে নাও, তারপর একটু কাঠ কুড়িয়ে এনো, রান্না বসাতে হবে । গাঁশবত গুরুজী কোথায় গেলেন দাদা দাদা সবাই যেমন পাড়া বেড়াতে যায় উনি তেমন জঙ্গল বেড়ান ।
এখনই হয়তো এসে পড়বেন কথাটা শেষ করতেই পাগলাবাবা প্রবেশ করেন রমা আজ খিচুড়ি ভোগ করো, সতীশ আজ চাল-ডাল সবই সঙ্গে নিয়ে এসেছে; বলতে বলতে কুটিরে ফিরে আসেন পাগলাবাবা সুমনকে সামনে দেখেই এই সুমন; তুই আজ থাকবি নাকী? সুমন ঃ আপনি আদেশ করলে থেকেই যাব / পাগলাবাবা ঃ অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ গুরু আদেশ করলেই গুরুর পাশে থাকা হবে? তা না হলেই গুরুর ইচ্ছার বিরুদ্ধ ক্রিয়া হবে । আমি যেন তোকে হাত ধরে টেনে ঘর থেকে আমার কাছে এনেছিলাম ।
নারে বাবা, তুই তোর ইচ্ছায় থাক বা না থাক, না হলে আবার চাকরী গেলে গুরুর দোষ হবে। সুমন ঃ কি যে বলেন না; আমি আজ কেন, বেশ কিছুদিন থাকব আর চাকরী গেলেও আপনাকে দোষ দেব না । আর সন্ন্যাস নিয়ে আপনারই সেবা করব । পাগলাবাবা মাইনে পাবি না কিন্তু তবে একটা অজাগতিক ব্যাঙ্কের খাতা খুলে দেব, সেখানে গুরু সেবার মজুরী কিছু কিছু যাবি করে পেয়ে কথাটা শেষ হতেই শাশ্বত। দিন না বাবা আমায় সুযোগ আমার তো আর চাকরী যাবার ভয় নেই ।
পাগলাবাবা কোনো উত্তর না করেই ৫রমা কাল থেকে মাছ ভাত খেতে দাওনি?" শাশ্বতকে ৪৫।
মুদ্রিত পাতা 46
শাশ্বত ৪ হ্যা হ্যাঁ বাবা, আমি মাছ, ভাত; শাক সব খেয়েছি দাদা-বৌদি খুব যত্ন করে আমায় খাইয়েছেন । পাগলাবাবা ও-সব খেয়েছ? তা-বাবা, পেটের জ্বালা থাকলে তো সেবা করা যায় না / আর শক্তি সাধন করতে গেলে ৩; নুন-ভাতয চলে না। তার জন্য রাজসিক ভাব লাগে। আর তার অভ্যাস করতে গেলে জাগতিক আহারও লাগে । জাগতিক খিদেটা মেটাতে আবার জাগতিক কর্মও লাগে বুঝলে?
শাশ্বত ঃ হ্ঁযাঁ বুঝেছি বাবা, তবে আমায় আদেশ করুন কী কর্ম আর কোধব কর্ম করব আমার কোথাও যাবার নেই ! আমায় শুধু আপনাবে গুরু বরণের সুযোগ দিন। গুরুকে পরীক্ষা করার আমার ৩ কিছু নেই । যাঁর সামনে দাঁড়ালে নিজের আমিত্ব হারায় যাঁর পদস্পর্যে নিজেকে ধন্য বলে মনে হয়, সেই-ই আমার গুরু আমায় করুন, বলে শাশ্বত গুরুর পায়ে শুয়ে পড়ে।
পাগলাবাবা ঃ উঠে পড় বলে, দুই হাত দিয়ে তুলে ধরে, আর শাশ্বতর মুখের দিকে ভালভাবে চেয়ে তুমি চিরন্তন, তুমিই পারবে, আমি তোমায় আগেও ডেকে ছিলাম, তুমিতো বোঝনি, শিষ্য যেমন পথে পথে গুরুকে খোঁজে, গুরুও তেমন শিষ্যকে ভাবে দেখ বারবার নানা বেশে নানী দিতে থাকে । আর তাকে কাছে আসতে পরিণতি নিজেই বলে । তুহিনের কিছু ভাঙতে ডেকে এনেছিল । আর সব জেনেও চায়নি ।
তখনই প্রবেশ একজন করে পাগলা লোক গদ গদ্ চিত্তে কুটিবে বাবাকে একগাল দেখেই হাতজোড় করে প্রণাম করে হাসিমুখে কথা গুরুজী আমার বলার ছিল কিছু আপনার সাথে দয়া পাগলাবাবা করে যদি এনাদের হ্যা একটু সরতে বলেন " বলুন না, আপনার একটাই কান । যা দিয়ে কোনো অসুবিধা হবে না, এদের সব কথা শুনতেও শুধু আমারটাই পাবে শুনতে পায়, ওরা আপনার না আপনি বলতে পারেন ৪৬।
মুদ্রিত পাতা 47
লোকটি (একটু হেসে;) আসলে আমার ব্যবসার কথা তো, বেশ কিছু দিন হলো, ব্যবসাটা ভালো যাচ্ছে না / অনেকগুলো টাকা আটকে আছে, তাই ভাবলুম আপনাদের আশীর্বাদে যদি টাকাগুলো তাড়াতাড়ি বের করে নেওয়া যায় পাগলাবাবা তা বেশ করেছেন আমার কাছেই এসেছেন তাইতো আমি এই নিরিবিলিতে দোকান খুলেছি । পাছে না অন্য কোথাও কারও কাছে চলে যান ।
লোকটি (একটু অপ্রস্তুত হয়ে পরে) "না মানে, আপনি যদি আপনার ঠাকুরকে একটু আমার অসুবিধার কথাটা জানিয়ে দিতেন, তাহলে হয়তো এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতাম " পাগলাবাবা তবে আমার ঠাকুর যদি ভাগ চেয়ে বসে । আপনি বরং এক কাজ করুন, আমার ঠাকুরকে আপনিই কিছু অগ্রিম দিয়ে বলে দেখুন, আমার ঠাকুর আপনার কথাও বুঝতে পারবে ফল হলে আবার এসে নয় বাকীটা দিয়ে যাবেন ।
লোকটি ঃ না মানে এমন নয়, একবার জানিয়ে যাই বলে কিছু টাকা আসনে রেখে প্রণাম করে বেরিয়ে যায় । পাগলাবাবা সুমন, দেখতো তোর মাইনের কতটা পেলি? সুমন : উফ্ ! সবসময়ই আমি? পাগলাবাবা ঃ নারে, তোকে নিয়েই তো আমার চিত্তা তোকে ধ্যানে বসালে নাকি তোর আবার ঘুম পেয়ে যায় তোর কর্মস্থলে নাকী একটুও তোকে নাওয়া-খাওয়ার সময় দেয় না / তাই ধ্যানে চোখ বুঝলেই তোের ঘুম এসে যায় ।
সুমন : না না; সেদিন সারারাত একটা সিনেমা বউ এর সাথে বসে দেখে ফেলেছিলাম, তাই সকাল থেকে খুব ঘুম পাচ্ছিল চোখ বুঝতেই চোখটা একটু লেগে গিয়েছিল । কিন্তু রোজ রোজ তো এমন হয় না । 89।
মুদ্রিত পাতা 48
চাকরী বাকরী ছাড সমস্যা সমাধানের পাগলাবাবা ঃ তাইতো বলি, দোকান বেলায় সিনেমা দেখবি / আর সকালে খুলে ফেল । রাতের লোকের একটু ঘুমিয়ে নিবি লোকে ধ্যানে বসে ভাববে, সামনে বাবা সমাধি নিয়েছেন তবে চুল, দাড়ি একটু বাড়িয়ে নিতে হবে আর তিলক টেনে নিলেই পসার জমে যাবে । আগে মালা, তোর সমস্যাই সমাধান হয়ে যাবে ।
বৌদি সুমন আগে কাঠ নিয়ে এসো, নাহলে রান্না বসাতে দেরি হয়ে যাবে সুমন ঃ হ্যা যাই বলে, কাঠ কুড়োতে জঙ্গলে চলে যায় পাগলাবাবা রমা, আজ কী আলু চোখা ডাল ভাত? সঙ্গে একটু দিয়ো কিত্তু / বৌদি : কি? এই তো কিছুক্ষণ আগেই খিচুড়ি ভোগ হবে বললেন আবার ভাত-ডাল কোথা থেকে এল? পাগলাবাবা খিচুড়ি আর বেগুনি হবে? তাহলে তো কোনো কথাই নেই / কী বলো শাশ্বত ! তুমি তো আবার খিচুড়ি খুব পছন্দ কর ।
শাশ্বত হ্যাঁ, আমার তো খিচুড়ি আর বেগুনি খুব প্রিয় খাবার পাগলাবাবা ঃ তাই; তাহলে অমল আর দেরি বেরিয়ে করো না, তুমি বরং এখনি পড় । একটু বেশি করে কিছু মুরগির ডিম নিয়ে অমল : হ্যাঁ হ্যা এসো । বাবা, আপনি ডিম খাবেন; আমি পাগলাবাবা ঃ এখনই নিয়ে কেন? আসছি । আর তুমি বোধ হয় লোকে কী খাবে বলবে? না । একেবারে নিরামিশ?
রান্না রমা, তুমি তো এখন রান্না ঘরেই যাও, সতীশ তুমি করবে; তবে তুমি আমাদের পুজোর জোগাড়টা করে শাশ্বতকে নিয়ে আমার সতীশ : ফেলো আচ্ছা বাবা, এসো ভাই শাশ্বত, ফুল তুলে নিয়ে আসি । ৪৮।
মুদ্রিত পাতা 49
এই যে শাশ্বত তুমি একটু বুঝে নিও তোমার তো আবার পাগলাবাবা এখানেই থাকার পরিকল্পনা আগে গোছানোর কাজটা শিখে নিতে হবে । তারপর আসনে বসতে হবে যাও যাও সব দেখে নাও । শাশ্বত ৪ হ্যা যাচ্ছি বাবা, একটু স্নানটা করে যাই । পাগলাবাবা : তোমার তো আবার স্নানই হয়নি । ও থাক তুমি ফুল নিয়ে এসো, আমি বরং ফুলকেই স্নান করিয়ে নেব " শাশ্বত অবাক হয়ে দেখে আর ভাবে, সত্যিই পাগলাবাবা, যে বলেন কিছুই বোঝা যায় না । সাধু নাকী নিরামিশ খেলে লোকে হাসবে ।
সতীশ : চলো চলো ভাই, দেরি হয়ে যাবে; ওনার কথা কিছু ধরতে যেও না । এখন তুমি বুঝতেও পারবে না । শাশ্বত : হ্যাঁ চলুন; (চলতে চলতে) আচ্ছা সতীশ দা, আপনার বাড়িতেই তো কাল উনি ছিলেন; তাই না? কী করলেন ওখানে সারাদিন? সতীশ : ওরে বাবা; সে আর কী বলব, একে তো পাগলাবাবা, তুমি দেখেই খানিকটা বুঝেছ । বাড়ি আসছেন শুনে তোমার বৌদি আবার অনেক আত্মীয় স্বজনকে নিমন্ত্রণ করে আসে, আমাদের গুরুদেব আসছেন বলে । তাই বেশ কিছু আত্মীয় আমার ঘরে চলে এসেছিল ।
এদিকে আমাদের পাগলাবাবা ঘরে ঢুকলেন তো প্যান্ট শার্ট পরে; তার উপর বয়সেও আমার চেয়ে কম । শাশ্বত : কত বয়স হবে ওনার? সতীশ : ছেচল্লিশ মাত্র ঘরে ঢুকেই কোনো কথাই না বলে, বউকে বললেন চা করা আছে তো?
সঙ্গে বিস্কুট দিয়ে তাড়াতাড়ি নিয়ে এসো, ঘর ভর্তি লোক তখন, আমাদের গুরু এসেছেন জেনে; একে একে প্রণাম করতে শুরু করেছে সবে, পাগলাবাবা তারই মাঝে বলে ওঠেন, কী হলো চা করা নেই নাকী?" আমি বললাম, এখনই আনছে আপনাকে সবাই প্রণাম করতে করতে সব এসে যাবে । ৪৯।
মুদ্রিত পাতা 50
উত্তরে বলেন "খালি পেটে বিষ হজম পরগলা বাবা তবে প্রণামটা এখন বন্ধ রাখো, কিছু খাই তারপর শুরু 4, তবে করো। সবাই একটু এদিক-ওদিক চায়, আর যেন সবাই থমকে দাঁড়াবা আমি বললাম এখনই এনে দিচ্ছি বলে আমি ঘর থেঁকে বেরতেঃ আমার সাথে সাথে সবাই বেরিয়ে আসে । আমাকে আবার একজন প্রশ্ন করে ওঠে; উনিই দীক্ষা-টীক্ দেন? উনিই কী তোমাদের গুরুদেব নাকী অন্য কেউ আঙ্ঞো: আমি বললাম উনিই আমাদের গুরুদেব আর উনিই দীক্ষা (ন তবে খুব বেশি লোককে দীক্ষা দেননা ।
সে আমার কথা শুদে বে কী জানো? লোকেও হয়তো যায় কম / আমার বেশ রাগ আমি বেশ রাগ করেই বলি হ্যাঁ কারণ উনি তো আর লোব আনার জন্য গুরু সেজে বসে থাকেন না?
তাই যাদের সদগশুকু প্রয়োজন থাকে) কোনো বিজ্ঞাপন ছাড়াই তারাই অলৌকিক ভাবে তাঁর কাছে পৌঁছে যায়, আর তাঁর বেশভূষা না দেখেই তাঁকে ৩ষ করার আশায় তাঁর পায়ে মাথা নত করে পড়ে থাকে আমার কথায় তার বোধহয় সেভাবে মনে ধরেনি, কোনো উত্তর পাশ কাটিয়ে যায় না করে শাশ্বত আসলে ওনাকে বোঝা খুব শক্ত; বা আমরা সাধারণ চোখে যা দেখেছি বুঝেছি তাতো উনি নন । তাই তাঁকে সম্ভব নয় । সকলের পক্ষে বোঝাও সতীশ ঃ হ্যাঁ ঠিকই বলছ ।
কিছু ভণ্ড লোক বিজ্ঞাপনের আছে; প্রচারে বেশধারী, সাধু সেজে ভগবান নিয়ে ব্যবসা ওদেরই বিশ্বাস করছে; করে আর মানুষগুলো প্রতারিত হচ্ছে । শাশ্বত আচ্ছা, সতীশ দা উনি তারপর বললেন, আসনে আগে বসবে পুজোর জোগাড় শেখো; লাগবে । আচ্ছা এই জোগাড় শিখতে কতদিন ৫০।
মুদ্রিত পাতা 51
সতীশ নানা ধরণের পুজোর নানা ধরণের জোগাড় শিখতে হবে এখন তুমি নিত্য পুজোর জোগাড় শিখবে তারপর আস্তে আস্তে সব শিখে নেবে বেশ কিছুদিন লাগবে। এসব শিখতে।
তবে তুমি চিত্তা করোনা, যে পুজোর জোগাড় দেয়, সে-ও পুজোর অর্ধেক ফল পায় / তাই সময় লাগলেও এপথে কর্মের ফল তোমার আজ থেকেই শুরু হয়ে গেল পাগলা বাবা নিশ্চই আলাদা কিছু বুঝেছেন; তাই এত তাড়াতাড়ি তোমায় একাজে হাত লাগাতে দিয়ে দিয়েছেন শরাশ্বত : হ্যা, এবার আমি বুঝলাম, কেন আমাকে একাজ এত তাড়াতাড়ি দিলেন, আসলে আমাকে উনি অনেক আগে থেকেই চিনতেন বা জানতেন, আমিই শুধু এতদিন বুঝে উঠতে পারিনি তাই আমারও খুব চেনা চেনা লাগছিল ।
উনি আমার বন্ধু তুহিনকেও চিনতেন আমার বোধহয় অনেক আগেই আসা উচিৎ ছিল । তবে আর ছাড়ব না আমাকে জানতেই হবে কেন এত সুস্থ মানুষগুলো এভাবে পাগলের মতো জীবন যাপন করে এবং আমাদের মতো মানুষগুলো যারা নাকী নিজেদের জ্ঞানী মনে করেও জীবনের উঠে আসা আচমকা ঝড়ে দিশেহারা হয়ে ভুলের পর ভুল করতে থাকে !
সতীশদা আর যাদের ভগবানের প্রতি আস্থা থাকে তাদের আবার ভগবানই পথ দেখিয়ে দেন, বুঝিয়ে দেন, তোমার জীবনের উঠে আসা ঝড় তোমার জীবনে সঠিক পথের হদিশ এনে দেবে। শাশ্বত; ফুল গুলোকে এই পুষ্প থালায় এক এক করে রাখো, বেলপাতা, দূর্ব্বা জলে ধুয়ে নিয়ে এই ফুলের পাশেই রাখো আর এই বাটিতে একটু চাল আর এই দুটি বাটিতে লালচন্দন, সাদা চন্দন আলাদা করে রেখে দিতে হবে । ডানদিকে একটা পাত্রে একটু জল দিয়ে পুষ্করিনি করে রাখতে হয় ।
এই হল কোষাকুষি; ধুয়ে উপর করে রাখো তার সামনে তাম্রকুণ্ড রেখো আসনের বাম দিকে ঘণ্টা রেখো আর বামদিকে ধূপ আর ডানদিকে দীপ সাজিয়ে দিও । বামদিকে একটু উপরের দিকে নৈবেদ্যর থালা সাজিও; পাশে।
মুদ্রিত পাতা 52
জা।গতি তাজগতিক দিও কর্পূর ৩গরু আর তীর্থের শিশি ৩[(@।;1 ?।।)। (lচখে প্রাথমিক ক্রিয়া । এরপর 41 পাশে রেখে দিও 21*। দেশে দেখতে শিখে গবে। স্নীন সেরে) লাল বস্ত্র পরে সামনে দাড়ায় । পাগল।4।4।
সর^ , গোছানো হলো ।" সতীশ ৪ এবারে আপনি বসতে পরেন পাগলাবাবা আসনে দাঁড়িয়ে 'শাশ্বত তুমি স্নানটী তাড়াতাড়ি গেরে চলে এসৌl' শাশ্বত স্নান করতে বেরিয়ে যায়, তাড়াতাড়ি স্নান সেরে কাপড বদলে ঘরে ঢুকে আসে, সবাই মাটিতে বসে আছেন, বৌদি ঈশারার শাশ্বতকে বসতে বলেন । গুরুজী বাণলিঙ্গের উপর পুজো করছেন; গায়ে রক্তবস্ত্র, কপালে রক্তচন্দনের তিলক একেবারে অন্য মানুষ !
চোখের দৃষ্টি কেমন ভাসাভাসা, চোখ খোলা থাকলেও কেমন যেন চোখ বন্ধের আভাস, নিজের খেয়ালেই যেন অন্য জগতে বিচরণ করছেন । এই পুজোয় কোনো জোরে জোরে মস্ত্র পাঠ নেই । এই পুজো যেন আরাধ্য দেবতার সঙ্গে মিলিত হয়ে তৃপ্তির আশ্বাস । থমথমে পরিবেশ সবাই চুপ করে বসে পাগলাবাবার দিকেই চেয়ে আছে । এবারে ঘণ্টা বেজে ওঠে।
গুরুজী বেলপাতার একহাতে ঘণ্টা; আরেক হাতে ফুল অর্ঘ্য তুলে মন্ত্র পাঠ করতে করতে করছেন যেন, আরতি /তারপর সেই অর্ঘ্য বাণলিঙ্গে শুয়ে আরাধ্য প্রদান করেন । আর ভূমিতে দেবতার চরণে মাথা রাখেন । কিছুক্ষণ পর বাণলিঙ্গ মাথায় থেকে ফুল তুলে ঠেকাতে নিজের থাকেন মাথায় (শাশ্বত ও সবার মাথায় একটু ফুল তুমি এদিকে এসো বলে) শাশ্বতর ঠেকিয়ে পাগলাবাবার কপালে চন্দনের চোখে যেন তিলক টেনে দেন। জল ভাঙা ভাঙা গলায় বলেন যাও।
মুদ্রিত পাতা 53
তুমি বাইরে বসো এখন, আর আসন ছেড়ে উঠে পড়েন, শাশ্বত পাগলাবাবাকে প্রণাম করে বাইরে বেরিয়ে আসে, সকলে এক এক করে প্রণাম সেরে বাইরে বেরিয়ে যায় পাগলাবাবা একা খানিকক্ষণ ঘরে থেকে যান, কিছুক্ষণ থাকার পর আবার বাইরে দালানে বেরিয়ে আসেন । শশ্বত ৪ বাবা, এখন আমায় কাজ করতে হবে?
পাগলাবাবা না, এখন তোমার কোনো কাজ নেই, তুমি রমাকে জিজ্ঞেস করো, সে বলে দেবে বৌদি ভাই তুমি আমার সাথে এসো, আর আমি যা করছি, তা ভালভাবে শিখে নাও, বলে পুজোর জায়গা পরিষ্কার করতে থাকেন । পুজোর ফুল পুষ্করিনিতে ফেলেন ও পুজোর দ্রব্য যথাস্থানে রেখে দেন সূমন আর তুমি দালানে খাবার জায়গা করে নাও ।
শাশ্বত দালানে এলে; পাগলাবাবা চেয়ারে বসে আছেন সুমন গুরুজীর আসন পেতে দেন বৌদি ভোগ সাজিয়ে পাগলাবাবাকে বসতে বলেন পাগলাবাবা ঃ সবাই একসাথে ভোগ গ্রহণ করো সকলেই একে একে বসে পড়ে । সকলেই ভোগ গ্রহণ করে গুরু প্রসাদ ভক্তিভরে তুলে নেয় খাওয়া শেষ হলে, পাগলাবাবা; সুমন দালানে একটা মাদুর আর বালিশ দিয়ে যা; আমি এখানেই একটু বিশ্রাম করে নিই ।
মাদুর-বালিশ পেতে দিলে পাগলাবাবা শুয়ে থাকেন আর সকলে তাঁকে ঘিরে দালানে বসে থাকে এমন সময় একজন কুটিরে প্রবেশ করে । পাগলাবাবা তাকে দেখেই "আসুন; কী খবর বলুন, কিছু ঠিক হলো?" ভদ্রলোক ঃ আপনার কথামতো, ঘর পেয়েছি, এবং সবাই খুব খুশিও হয়েছে । পাগলাবাবা ঃ তা জায়গা ভালো তো, ঠিক আছে; নিজেই গিয়ে দেখে নেব আমি বরং কাল সকালে।